৩০ এপ্রিল ২০২২


ক্ষমা করবেন স্যার

শেয়ার করুন

আকাশ চৌধুরী : একটি আবেগ, একটি অভিমান আমার জীবন থেকে কেড়ে নিলো বাইশটি বছর। যদিও বিষয়টি খুব সামান্য ছিল; কিন্তু শুধু আবেগতাড়িত হয়েই আমি আমি এতোগুলো বছর নিজের ক্ষতি নিজেই করেছি। বঞ্চিত হয়েছি না জানা অনেক তথ্য থেকে। অথচ এই লোকটার সংস্পর্ষে থাকলে জ্ঞানের পরিধি বিলক্ষণ বেড়ে যেতো। আজ আমি অতি অনুতপ্ত যে; তাঁকে হারিয়ে এই অনুশোচনা করছি।

বলছিলাম সদ্য প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা। যাঁকে আমি ‘স্যার’ বলে সম্বােধন করতাম। বাংলাদেশ হারিয়েছে অন্যরকম একজন অভিভাবক। যাঁর মেধা, দেশপ্রম, সততা এই মাতৃভূমিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। যিনি কিনা সারাজীবন সাফল্যের বরপুত্র ছিলেন।

মুহিত স্যারের সাথে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০০০ সাল অথবা ২০০১ সালে; সিলেটের স্থানীয় দৈনিক মানচিত্র পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জনাব লুৎফুর রহমানের (বর্তমানে জীবিত নেই) মাধ্যমে।

মহাজোট বা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি একজন সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এখান থেকেই তার কর্মজীবন শুরু নয়।

মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনীতি নিয়ে ৩০টির অধিক বইয়ের লেখক আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত হন।

১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর তখনকার পাকিস্তান এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। আর তখনই তার সাথে আমার পরিচয় হয়।

আমার যতটুকু স্মরণ হয় ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার সময় মানচিত্র পত্রিকার প্রধান সম্পাদক লুৎফুর রহমান ভাই আমাকে নিয়ে ঢাকায় যান। ওই নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। একদিন পর (তারিখটা স্মরণ নেই) তিনি আমাকে বললেন, ‘চলো দেশের খ্যাতিনামা এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়ে আসি।’

তখনও আমি জানিনা সেই খ্যাতিমান ব্যক্তি কে! ওই সময়কার ছোট একটি ইয়াশিকা ক্যামেরা নিয়ে আমরা হাজির হই ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ সংলগ্ন আবুল মাল আবদুল মুহিত স্যারের বাসায়। লুৎফুর ভাই বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন আর আমি সেগুলো নোট করছিলাম। এসময় মুহিত স্যার সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত হলে আলোকিত সিলেট গড়বে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

হোটেলে ফিরে সেই সাক্ষাৎকারটি আমি লিখি; যেটার শিরোনাম দিয়েছিলাম, ‘একান্ত সাক্ষাৎকারে আবুল মাল আবদুল মুহিতঃ আমি আলোকিত সিলেট গড়তে চাই।’ ফ্যাক্সযোগে ওই সাক্ষাৎকার মানচিত্র সিলেট অফিসে পাঠানোর পর তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সোয়েব বাসিত আট কলামে লিড করে দেন। ওই সময়ে নির্বাচন সংক্রান্ত দেশের কোনও পত্রিকায় এটাই ছিল আবুল মাল আব্দুল মুহিতের প্রথম সাক্ষাৎকার।তৎকালীন সময়ে ওই সাক্ষাৎকারটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল।

কিছুদিন পর মুহিত স্যার সিলেটে আসেন এবং নিয়মিত নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেন। নির্বাচন সংক্রান্ত খবর সংবাদপত্রে কভার করার জন্য মুহিত স্যার মানচিত্রের প্রধান সম্পাদককে বললে তিনি আমাকে এর দায়িত্ব দেন। এরপর থেকে কোম্পানীগঞ্জসহ (আগে সিলেট-১ আসনে ছিল) বিভিন্ন স্থানের গণসংযোগে আমি তার সঙ্গে যেতাম এবং সভা-সমাবেশের খবর দৈনিকগুলোতে সরবরাহ করতাম। অর্থাৎ তার ‘প্রেস সেক্রেটারীর’ দায়িত্বটা আমাকেই পালন করতে হয় কিছুদিন।

একদিন তার সঙ্গে গণসংযোগে যাই, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ইফতেখার হোসেন শামীম (বর্তমানে জীবিত নেই), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান এম, তৈয়বুর রহমান (বর্তমানে জীবিত নেই), তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি (বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক) শফিউল আলাম চৌধুরী নাদেলসহ আরও কয়েকজন। সিলেট থেকে গাড়িতে করে কোম্পানীগঞ্জ যাওয়ার পর একটি ছোট নৌকা দিয়ে অবহেলিত এক গ্রামে যাই আমরা। নৌকায় আমাদের সাথে ছিল শহরের প্রীতিরাজ রেস্টুরেন্ট থেকে নেয়া বিরিয়ানির প্যাকেট। দুপুর হয়ে যাওয়ায় আমরা তা সেখানে বসেই খেয়ে নিই।

নৌকা থেকে তীরে উঠার সময় মুহিত স্যার হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তখনই আমার মন বলেছিল নির্বাচনে তার অবস্থান হয়তো ভাল হবে না। ফলাফল তাই হল। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি নেতা এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে পরাজিত হন। যা হোক, এর আগে কয়েকদিন সিলেটের হাফিজ কমপ্লেক্সের বাসায় যাই মুহিত স্যারের সঙ্গে সংবাদপত্রে নির্বাচনী খবর নিয়ে আলোচনা করার জন্য। গণসংযোগ শেষে আগের দিনই তিনি আমাকে বলে দিতেন কখন যেতে হবে। যতদিন সকাল বেলা কোম্পানীগঞ্জে তার সঙ্গে গণসংযোগে গিয়েছি প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যায় বা রাতে ফিরতে হতো সিলেট শহরে।

আমাকে কাছে পেলেই তিনি শুধু বলতেন ‘তুমি এম এম আকাশ’( ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়লের অধ্যাপক)। বলতেন, ‘তোমাকে দেখলেই এম এম আকাশের কথা মনে পড়ে’।

একদিন হাফিজ কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখি দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ও তৎকালীন সিলেট ব্যুরো প্রধান এম এ রহিম তার সঙ্গে কথা বলছেন। তারা গিয়েছিলেন সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। এর আগেই আমি মুহিত স্যারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে চলে আসি। এভাবে বিভিন্ন সময় কেটেছে তার সঙ্গে। ওই নির্বাচনের পর তিনি আবার ঢাকামুখী হয়ে গেলেন। মাঝেমধ্যে সিলেটে আসতেন। নির্বাচনের পর তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

তবে ২০০৩ সালের জুন মাসে ‘সিলেট নগর উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে আমি তাকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। গোলটেবিলটি ছিল তৎকালীন সময়ে আমার সম্পাদিত অনিয়মিত মাসিক খোলাকলম-এর উদ্যোগে। ‘নগর উন্নয়ন শীর্ষক’ এটাই ছিল সর্বপ্রথম গোলটেবিল। তিনি ঢাকায় অবস্থান করায় টেলিফোনে তাকে অনুরোধ করেছিলাম গোলটেবিলে উপস্থিত থাকার জন্য। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি সিলেটের উন্নয়নের স্বার্থে ওই গোলটেবিলে এসে কথা বলবেন। কিন্তু টেলিফোনে আমাকে সরাসরি তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। আমি কোন কষ্ট পাইনি; কারণ আমি জানি তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ এবং এরচেয়েও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান তার ছিল। তবে অভিমান করেছিলাম। ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচিত হয়ে অর্থমন্ত্রী হন। সেই অভিমান থেকে দেখা করিনি। বলিনি যে স্যার আমি আপনার সেই ‘এম এম আকাশ’।

তবে তার কাছে না গেলেও সবসময় শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও শুভকামনা ছিল স্যারের প্রতি। ২০০৯ সালে তাকে উদ্দেশ্য করে ‘আলোকিত সিলেটের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং কিছু কথা’ শিরোনামে একটি লেখা (সাপ্তাহিক রোববার, ৩মে ২০০৯ এ প্রকাশিত) লিখি। সেই লেখাতেও আমি কিছুটা স্মৃতিচারণ করার চেষ্টা করেছিলাম। ওই সময় থেকেই দেখে আসছি হঠাৎ করেই অনেকে মুহিত স্যারের সংস্পর্শে যেতে শুরু করেন। যাদের এর আগে বা ২০০১ সালের নির্বাচনে দেখিনি। তাদের অনেকেই হয়ে ওঠেন স্যারের ঘনিষ্টজন।

যা হোক, স্যার আজ আমাদের মাঝে আর নেই। তার সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটি এখনও আমার চোখে ভেসে ওঠে। অভিমনা ছেড়ে দিয়ে যদি স্যারের কাছে যেতাম, আবদার রাখতাম অবশ্যই তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। তার চেয়েও বড় কথা এমন একজন গুণী মানুষের কাছ থেকে আবেগতাড়িত হয়ে যে দূরে থেকেছি তাতে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। কোনও কিছু পাওয়ার আশায় নয়, তার সংস্পর্শে থাকলেও আমি অনেক কিছু শিখতে পারতাম। না জানা অনেক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান আরোহন করতে পারতাম। কেন এই বাইশটি বছর নষ্ট করলাম তা ভেবে পাচ্ছি না।

আপনার সাথে এই দীর্ঘ সময়টা যে অভিমান করে থাকলাম, যে দু:সাহস দেখালাম সেজন্য আমায় ক্ষমা করে দেবেন স্যার।

(লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ।)

শেয়ার করুন