১৮ এপ্রিল ২০২২
ইউনুছ চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : ‘সর্বশেষ ২শ টাকা চাঁদা দিয়েছি‘ বলছিলেন রফিক উদ্দিন সাধু। ‘নদীর দুই পারেই ছিল ঘন বাঁশ ঝাড়। দুই পারের বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে একটি শিকল বেঁধে রাখা হতো । লম্বা শিকল পানিতে ডুবে থাকতো। একদিক থেকে টান দিলেই উপরে উঠে আসে। কোন বাণিজ্য নৌকা আসতে দেখলেই শিকল টেনে চাঁদা আদায় করতো ভাটপাড়ার মজিদ ডাকাদের লোকজন। ২০০০ সালের পর নৌ পথটি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়।’ বলেন এক সময়ের বানিজ্য নৌকা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ী আশি উর্ধ্ব রফিক উদ্দিন সাধু।
সিলেটের তৎকালীন বাণিজ্য কেন্দ্র চাঁদনীঘাট-কালিঘাট থেকে হারার বাজার (হারার সকলের, বিভিন্ন বারে বাজার বসতো সবগুলো বাজারের জন্য মালামাল নিয়ে যাওয়াকে বলে হারার বাজার) নিয়ে বানিজ্য নৌকা বের হতো। একটু উজানের দিকে এসে বর্তমান কুশিঘাট দিয়ে নৌকা প্রবেশ করতো কুশিগাঙ-এ। কুশিগাঙ হয়ে টুলটিকর এলাকার সোনাপুর, মেজরটিলার ভাটপাড়ার পাশদিয়ে বর্তমানে সিলেট-তামাবিল বাইপাস এলাকার বাহুবল হয়ে দাশপাড়া, পীরের বাজারের দক্ষিণদিকে বড় হাওরের (সিলেট সদর, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তা উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত) মাকুলি-হাকুলি বিল হয়ে সদর উপজেলার শেষ সীমা পুলিয়া এলাকা দিয়ে নৌকা জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল এলাকায় প্রবেশ করে।
চিকনাগুল হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের পূর্বদিকে বড় হাওরের কান্দি এলাকায় কুশিগাঙ এর সাথে যুক্ত হওয়া কাপনা নদী হয়ে নৌকা হরিপুর বাজার-হরিপুর মাদরাসা হয়ে হেমুর মধ্যে দিয়ে গিয়ে মানিকগঞ্জ বাজার অতিক্রম করে গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল জলাবনের পাশ দিয়ে জলুর মুখ এলাকায় চেঙ্গের খালে (সারি-গোয়াইন নদী) পড়ে। জলুর মুখ থেকে চেঙ্গের খাল হয়ে পশ্চিম দক্ষিণ দিকে সালুটিকর এবং উত্তর-পূর্ব দিকে গোয়াইনঘাট সদর হয়ে পিয়াইন নদী দিয়ে নৌকা পৌছে যায় জাফলং বাজার।
অপরদিকে, কান্দি থেকে নৌকা কুশিগাঙ হয়ে সোজা ওমনপুর, বালিপাড়া হয়ে বড় হাওরের মেধল বিলে পাবিজুড়ি, খ্যাপা ও করিস গাঙ এর মিলনস্থল ত্রিগাঙ্গায় গিয়ে পড়ে। খ্যাপা ও করিস গাঙ হয়ে নৌকা করিসের পুল, গর্দনা ও ধামড়ী হয়ে হেমুর বন্দে কাপনা নদী এবং সুকইপুর, টেংরা, বিছলানাটেক, ভাইয়া, টিকরমাটিখেল হয়ে পুড়াখাই এলাকায় গিয়ে সারি নদীতে পড়ে। মেধর বিল থেকে উত্তরপূর্ব দিকে পাবিজুড়ি নদী হয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার ছাতারখাই অতিক্রম করে কানাইঘাট উপজেলার সীমায় এসে ইছাবা নদী হয়ে চতুল এলাকায় লাইন নদী ধরে বড়জুড়ি, কান্দিরপার, রানিফৌদ, দরবস্ত, নয়াগাতি-বারোগাতি এলাকা দিয়ে নৌকা গিয়ে ভিড়ে সারিঘাট বাজার।
কুশিগাঙ এর প্রথম অংশে নতুন সিলেট সেনানিবাস সংলগ্ন স্থানে কুশিগাঙ এর সাথে সংযুক্ত বাঘা খাল হয়ে পূর্ব দিকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের বাঘা হাওর (বড় হাওরের অংশ) হয়ে কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ, গাছবাড়ি বাজার, বীরদল, কানাইঘাট সদর সহ জকিগঞ্জের শাহগলী বাজারে গিয়ে ভিড়ে নৌকা। রাজাগঞ্জ বাজার হয়ে রাজাগঞ্জি খাল ও নয়া খাল, গাছবাড়ি বাজারে গঞ্জিখাল, বড়দেশ বাজারে মাছুখাল ও ছত্রপুরী খাল, বীরদল বাজারে বীরদল খাল, কানাইঘাট সদরে ধড়ফড়ি নদী হয়ে বড় হাওর থেকে সুরমা নদী হয়ে নৌকা আবার ফিরে আসে সিলেট চাঁদনীঘাট-কালিঘাট।
স্থানীয়দের ভাষায় এই বিশাল নৌ পথ একসময় এই অঞ্চলের ব্যবসা বানিজ্য ও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল। কালিঘাট থেকে বড় বড় নৌকা মালামাল বোঝাই করে কুশিগাঙ হয়ে এই নৌ পথে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা, কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ, গাছবাড়ি, বড়দেশ, সদর, চতুল, জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত, সারিঘাট, হরিপুর, মানিকগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পর্যন্ত যাতায়াত ছিল। আবার সেইসব স্থান থেকে বালু পাথর, ফল, ফসল নৌকায় একই পথ ধরে সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হতো বলে জানান তারা।
মূলত সীমান্তের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা সারি নদী থেকে উৎপন্ন লাইন নদী, খ্যাপা নদী, পাহাড় থেকে নেমে আসা সুরই নদী, লোভা ছড়ার আমরীখাল, নকলা নদীসহ বিভিন্ন নদী, খাল ও ছড়ার মিলিত প্রবাহ থেকে সৃষ্ট কুশিগাঙ বড় হাওর হয়ে সুরমা নদী পর্যন্ত দীর্ঘ নৌ যোগাযোগের পথে পরিণত হয়।
‘আমার বর্তমান বয়স ৮৪ বছর।’ বলেন রফিক উদ্দিন সাধু।
এই বয়সেও যথেষ্ট সাবলীল এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বলেন, একে বারে ছোট থাকতেই নৌকার ব্যবসা শুরু। আমাদের নৌকা মালামাল নিয়ে বিভিন্ন বাজারে যায়। সে সময় জাফলং, রাধানগর, গোয়াইন বাজার, হরিপুর বাজার, কুয়োরের বাজার, চতুল বাজার, শাহগলী, গাছবাড়ি বাজারে নৌকায় মালামাল পরিবহন করতাম। তখন বিভিন্ন বারে বাজার বসতো। সোমবারে গোয়াইন বাজার, রোববারে রাধানগর, মঙ্গলবারে জাফলং, শনিবারে হরিপুর, রোববারে কুয়োরের বাজার এভাবে বাজার বারে মানুষ মালামাল ক্রয়-বিক্রয় করতে আসতো।’
‘কুশিগাঙ ছিল সিলেটের উত্তরপূর্বাংশের অন্যতম নৌ যোগাযোগের পথ। বালু-পাথর থেকে শুরু করে ধান-চাল, ফল-ফসল, নিত্যপণ্য সবই পরিবহন হতো এই পথে। বর্ষায় এই নৌপথ বিশাল জলরাশির প্রবল ধারায় পরিনত হতো। বর্ষার পরেও বছরের অধিকাংশ সময়ই নৌ পথটি সচল থাকতো। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের চরম উদাসীনতায় নৌ পথটি হারিয়ে গেছে।’ বলেন রফিক উদ্দিন সাধু।
কানাইঘাট উপজেলার সাংবাদিক আলাউদ্দিন জানান, তাদের পিতা ও পিতামহের জকিগঞ্জের শাহগলী বাজারে বড় ব্যবসা ছিল। কুশিগাঙ হয়ে নৌ পথেই মালামাল পরিবহন করা হতো। বড় হাওর হয়ে নৌকা আসতো শাহগলী বাজার, পরে যাওয়ার সময় সুরমা নদী ধরে সহজে সিলেট যেতো বলে তারা শুনেছেন। রাজাগঞ্জি খাল হয়ে নৌকা গোলাপগঞ্জ বাজারে যাওয়া আসা করতো বলে জানান তিনি।
জৈন্তাপুর উপজেলার কাটাখাল এলাকার ব্যবসায়ী হোসেন আহমদ ও দরবস্ত এলাকার ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান বলেন, এই নৌ পথে দিনভর নৌকার যাতায়াত দেখেছেন। অন্যদিক থেকে নিত্যপণ্য এবং এদিকে থেকে বালু পাথর নিয়ে অসংখ্য নৌকা চলাচল কতো।
এই পথে নৌকা চালিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জের ময়না মিয়া (৭৫)। জানান, তখনকার সময়ে নৌকা এতো বড় ছিল না। কালিঘাট থেকে তারা ১৫/২০ টি নৌকা নিয়ে এক সাথে বের হতেন। পথে ডাকাত বা কোন দুর্যোগের সম্মূখীন হলে যাতে সহায়তা করতে পারেন। গন্তব্যের কাছাকাছি আসার পর একজন একজন করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন। তখন ইঞ্জিন ছিলনা, বৈঠা, দাড় টানা বা গুন টানেই চলতো নৌকা। বাতাস অনুকূলে থাকলে তুলে দেয়া হতো পাল।
ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, মাঝে মাঝে ডাকাতদল হামলা করে মালামাল লুট করে নিয়ে যেত। ডাকাতের নৌকা দূর থেকে সব সময় অনুমান করা যায় না। যখনই বুঝা যেতো ডাকাতরা আসছে দ্রুত নৌকা কোন গ্রামের পাশে নিয়ে ডাক দিলে মানুষজন বেরিয়ে আসতেন।
টুলটিকর সোনাপুর গ্রামের পঞ্চাশ উর্ধ্ব কবির আহমদ স্মৃতিচারণ করে বলেন ‘ কুশিগাঙ হয়ে অসংখ্য নৌকা মালামাল নিয়ে যাওয়া আসা করতো। অন্যান্য নৌকার সাথে কাঁঠাল পেয়ারা নিয়ে নৌকা যেতো সিলেটে। কিশোর বয়সে ফলবাহী নৌকা দেখলে ছেলেরা ছুটে গেলে নৌকা থেকে তাদের কাঁঠাল, পেয়ারা দিয়ে যেতেন ব্যবসায়ীরা।
নৌ যোগাযোগের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় সবগুলো নদী-খাল এখন প্রায় অস্তিত্ব সংকটে উল্লেখ করে কানাইঘাটের আব্দুল জলিল (৭০) জানান, দখল আর ভরাটে ছোট হয়ে আসছে নদী-খাল। কানাইঘাট সদরের মধ্যে দিয়ে যাওয়া ধড়ফড়ি নদীর অস্তিত্বই এখন নেই। নদীর উপরেই সদর ইউনিয়ন অফিস, পৌর কার্যালয়, কানাইঘাট কলেজের মাঠ সহ শতশত বিল্ডিং স্থাপনা। রাজাগঞ্জি খালে স্থায়ী বাঁধ নির্মান করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মান করা হয়েছে বড়দেশ খালে।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা কমিটির অন্যতম সদস্য ছালিক আহমদ চৌধুরী বলেন, নদী-খাল শুধু যাতায়াতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, মাছ ছাড়াও জলজ উদ্ভিত ও প্রাণির আবাসস্থল। ভরাট-দখলে এসব হারিয়ে গেলে জলজ জীববৈচিত্রের যে ক্ষতি হবে অন্য কোন কিছুদিয়েই তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। নদী-খাল দখল মুক্ত ও সঠিক ভাবে খনন করা হলে উপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের বন্যা থেকে বিপুল পরিমান ফসল রক্ষা পাবে।
তিনি বলেন, ৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি রাস্তার উন্নয়ন কাজ শুরু হলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, ফলক উন্মোচন, দোয়া- মোনাজাত কত-কী হয়। কিন্তু কোটি টাকার নদী খনন কাজ শুরু হলেও কেউ বলতে পারে না, কখন শুরু কখন শেষ হয়।