১২ এপ্রিল ২০২২
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে নগদ সহায়তা বা কৃষি সামগ্রী প্রণোদনা দেবে সরকার। এছাড়া হাওর রক্ষায় বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়ে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাঙন ঠেকানোর বাঁধ কেন ভাঙছে সেই কারণগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল চাষাবাদ করা হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে হাওরের চার হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ২৫ হাজার কৃষকের ৬৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমিতে এবার বোরো আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় মোট চার হাজার ৩৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। জেলার ১৩৭টি হাওরসহ কৃষির সঙ্গে তিন লাখ ৭৮ হাজার ৭০৫টি পরিবার জড়িত। হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারাও বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে হাওরে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আয়েজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রকল্প নিতে পারছি। এখনকার মতো এতে প্রকল্প কখনই নেওয়া হয়নি। সুনামগঞ্জের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। প্রকল্প ৫০ কোটি টাকার ওপরে হলে সমীক্ষার প্রয়োজন আছে। সুনামগঞ্জের জন্য প্রকল্প নিয়েছি ৪৯৪ কোটি টাকার। নদী খননের ১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। একনেকে পাস হলে নভেম্বরে কাজ শুরু করবো। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। আগামী বছর থেকে এ সমস্যা হবে না। আগে এমন সমস্যা হয়নি।’
জাহিদ ফারুক বলেন, ‘গত ১ এপ্রিল থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০৯ মিলিমিটার। প্রতিবছর আগাম বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকি, এবারও ছিলাম। অনেকে বলেছে কাজ দেরিতে হয়েছে। কাজ দেরির কারণ আমরা ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ফেব্রুয়ারিতে শেষ করি। কিন্তু পানি জমে থাকায় সময়মতো কাজ শেষ করতে পারিনি। জানুয়ারিতে শুরু করেছিলাম, কাজটি শেষ পর্যায়ে ছিল। ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’
উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, ‘হাওরে আমি নিজে গিয়েছি। সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে আমি বলতে চাই, এ ক্ষেত্রে কারও কোনও গাফিলতি থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে হাওরে বাঁধ ভেঙ্গে ফসলের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বা কৃষকের কি ধরনের ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। যত দ্রুত সম্ভব তা নিরূপণের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে নগদ সহায়তা বা কৃষি সামগ্রী প্রণোদনা বাবদ সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করবে সরকার। তবে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের জন্য চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ মোট সাড়ে ১৪ কেজি পরিমাণের নিত্যপণ্যের এক হাজার প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। আরও এক হাজার প্যাকেট বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সপ্তাহখানেক পরই সুনামগঞ্জের হাওরের ধান পাকার কথা। ফসল তোলার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা কৃষকের। তবে এখন তাদের ব্যস্ততা ফসল রক্ষা বাঁধ বাঁচাতেই। দিন-রাত স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহায়তাও করছে। তবু ফসল বাঁচবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই অবস্থায় জেলার প্রায় ২৫ হাজার কৃষক পরিবার দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, জেলার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার একর জমির ফসল বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত আবাদি জমির পরিমাণ মাত্র ২ শতাংশ। আমরা অক্ষত বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখতে কাজ করছি। ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর জন্য এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছি।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, সার্বক্ষণিক জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ইতোমধ্যে এক হাজার নিত্যপণ্যের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। আরও এক হাজার প্যাকেট যাচ্ছে। এর বাইরেও সরকারের জিআর তহবিল এবং কৃষি প্রণোদনা সহায়তার জন্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। এ কাজটি শেষ হওয়া মাত্রই সার্বিক সহায়তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়াবে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরে বড় পরিবর্তন হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৃষ্টির সময় বদলে যাওয়া। গত কয়েকবছর ধরে প্রথম ধাক্কা মার্চ মাসের শেষের দিকে আসছে। ফলে সমাধানের জরুরি ধাপ হলো, বাঁধ সারাইয়ের কাজের সময় এগিয়ে আনতে হবে এবং কাজটি কৃষি মন্ত্রণালয়কে করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বাঁধের সমস্যা টেকনিক্যালি সমাধান করতে হবে। যেসব এলাকা ডুবে গেছে সেসব স্থানে বাঁধ টপকে পানি ঢুকেছে এমন না। নদীর পানি যখন বাড়ে তখন চুইয়ে বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকতে পারে। ফলে বাঁধের কাছ থেকে মাটি নিলে সেটি টিকবে না। সে জন্য মাটি সংরক্ষণ করা দরকার।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, ‘বাঁধ সঠিক সময়ে নিয়ম মেনে হয় না বলেই বারবার ভাঙে। হাওরের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বাঁধ দিয়ে সম্ভব না। মেঘনা পর্যন্ত নদী খনন না হলে এটা সম্ভব না। বাঁধগুলো সঠিকভাবে শেষ করতে হলে প্রথমত সময়মতো প্রকল্প কমিটিগুলো হতে হবে। আমরা এবারের পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ করতে গিয়ে দেখেছি, যে কমিটি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হওয়ার কথা সেটি শুরু হয়নি ডিসেম্বরেও। দেরিতে কাজ শুরুর কারণে একটা বাঁধও শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। এমনকি ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সে সময়ে ৯২ ভাগ বাঁধে মাটির কাজই শেষ হয়নি। পরে ১০ দিন সময় বাড়িয়ে নিলেও তা সম্ভব হয়নি।’