১০ এপ্রিল ২০২২


পানি কমায় কৃষকদের মধ্যে ‘আশার আলো

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : নলুয়ার হাওরের কৃষক ইজাজুল ইসলাম খান। প্রতিবছরের মতো এবারও হাওরে ১৩ কেদার জমি চাষ করেছেন। কিন্তু হঠাৎ আসা ঢলের পানিতে নদী ফুলে ফেঁপে উঠে হুমকির মুখে পড়ে নলুয়ার হাওরের একাধিক বাঁধ। দিনরাত পরিশ্রম করে বাঁধগুলোকে বেশ শক্ত করেন ইজাজুলসহ হাওরপারের কৃষকরা। এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিও। কিন্তু ইজাজুলের আতঙ্ক এখনো কাটেনি। ধার-দেনা করে চাষাবাদ করা ইজাজুল ভুগছেন অনিশ্চয়তায়। জমির কষ্টের সোনালী ফসল ঘরে উঠবে তো। কখন জানি আবারও কোন বাঁধে ফাটল ধরে।

টাংনির হাওরের কৃষক আবিদুর রহমান চৌধুরী। পার্শ্ববর্তী চাপতির হাওরেও জমি ছিল তার। জমির ধান কিছুটা পাকতেও শুরু করেছিল। কিন্তু বৈশাখী বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় চাপতির হাওরের ফসল। তলিয়ে গেছে আবিদুরের সেই জমিও। কিন্তু টাংনির হাওরের জমি এখনো তার আশার আলো জাগিয়ে রেখেছে। টাংনির হাওরের জারলিয়া বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছিল ফসল। স্থানীয় লোকজনের টানা ৪৮ ঘণ্টার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত জারলিয়া বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়। তবুও তার আতঙ্ক আর উৎকন্ঠা শেষ হয়নি। কারণ, রোববার ও সোমবার সীমান্তের ওপারের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। পানি কমলেও আবারও ভারী বৃষ্টিপাতে হুমকির মুখে পড়তে পারে হাওররক্ষা বাঁধ।

কেবল ইজাজুল বা আবিদুরই নয়, হাওরপারের কৃষকদের মাঝে আতঙ্কের শেষ নেই। যদিও কয়েক দিন ধরে পানি কমতে থাকায় কৃষকরা নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছেন।

জানা গেছে, গত কয়েক দিনের পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের সকল নদ-নদী পানিতে ভরপুর হয়ে যায়। হঠাৎ করে আসা ঢলের পানিতে হাওরের বাঁধগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। গেল ৬ দিনে জেলার অন্যতম বড় হাওর দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরসহ ছোটোবড় মোট ২১টি হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। ঘাম ঝরানো শ্রমের সোনালী ফসল হারিয়ে হাওরপারে শুরু হয় কান্নার রোল। হাওরগুলোর ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। গত কয়েক দিনে ১ দশমিক ০৭ মিটার পানি কমেছে বলে পাউবো সূত্র জানিয়েছে। পানি কমতে শুরু করায় আতঙ্কের মধ্যে কৃষকরা আশার আলো দেখছেন।

পাউবোর তথ্যমতে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি রেকর্ড করা হয় ৪ দশমিক ৮২ মিটার। পানির এ প্রবাহ ছিল বিপদসীমার নিচে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৪৬ মিটার। শনিবার সুনামগঞ্জে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। তবে সন্ধ্যা ৬টার আগের ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ২৬ মিলিমিটার। এর আগে গত বুধবার ৭৫ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়। এর আগের দিন মঙ্গলবার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩৪ মিলিমিটার। চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত কমে আসায় সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানিও ধীরে ধীরে কমছে।

অবশ্য আজ ও আগামীকাল চেরাপুঞ্জিতে আবারও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে পাউবো সূত্র জানিয়েছে। আবারও ভারী বৃষ্টিপাত হলে হাওরের বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে পারে।

এদিকে, ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওরের ফসল রক্ষায় উপজেলার রাজাগাঁও এলাকায় হাওররক্ষা বাঁধের বিকল্প হিসেবে দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য একটি বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কৃষকরা বাঁধটি নির্মাণ করেন। একইভাবে দিরাই উপজেলার টাংনির হাওরের জারলিয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন বাঁধটিও রক্ষা করেন স্থানীয় লোকজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পাউবো ও স্থানীয় লোকজনের টানা ৪৮ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় বাঁধটি বন্ধ করা হলে রক্ষা পায় টাংনির হাওর। তাহিরপুর উপজেলার গুরমার হাওরের বর্ধিত অংশের বাঁধকে বন্ধ করে হাওরের ফসল রক্ষায় একইভাবে দিনরাত বিরামহীন কাজ করছেন লোকজন।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল ৬ দিনে জেলার অন্যতম বড় হাওর দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরসহ মোট ১৪টি হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। তলিয়ে যাওয়া হাওরে মোট জমির পরিমাণ ৫ হাজার ১০ হেক্টর। এই জমি থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের কথা ছিল। তবে, কৃষি অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যানের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন।

কৃষি অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, দিরাই উপজেলার চাপতির হাওর ডুবে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর ও এরালিয়া হাওর ডুবে ৯৫ হেক্টর, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কালনার হাওর ডুবে ১০০ হেক্টর, ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওর ও টাঙ্গুয়ার হাওর ডুবে ১ হাজার ৬৫ হেক্টর, শাল্লা উপজেলার বাগাইর হাওর, কৈয়ারবন হাওর ও গজারিয়া হাওর ডুবে ২০০ হেক্টর, দোয়ারাবাজার উপজেলার হুগলিবিল হাওর ডুবে ২০ হেক্টর এবং ছাতক উপজেলার গোরাপুর ও গইজ্জারবিল হাওর ডুবে ৩০ হেক্টর জমির ইরি-বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

কিন্তু কৃষি অধিদপ্তরের ডুবে যাওয়া হাওরের তালিকায় ধর্মপাশা উপজেলার কয়রানী হাওর, শাল্লা উপজেলার খলারবন হাওর ও গোফরি হাওর, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার মধ্যবর্তী ঘোনা হাওর, ঘোটাইরা হাওর, জোয়ালভাঙ্গা হাওর, ছোন্নাবাল্লা-কাস্টগাং হাওরসহ ৭টি হাওরের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বাস্তবে ছোট-বড়সহ মোট ২১টি হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয় কৃষকরা নিশ্চিত করেছেন।

চলতি মৌসুমে ছোট-বড় ১৫৪টি হাওরে ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়। চাষাবাদ হওয়া জমি থেকে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকার ইরি-বোরো ধান উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু হাওরগুলো তলিয়ে যাওয়ায় এবার লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হবে না।

জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, পানি কমতে শুরু করায় কৃষকদের মাঝে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যদি আবারও চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টি হয় তাহলে কি হবে তা এখন বলা সম্ভব নয়। চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টিপাত না হলে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে পুরোদমে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়ে যাবে। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে কাটা হয়ে যাবে ৮০ পার্সেন্ট ধান। অবশ্য এখনো ধান কাটা কমবেশি হচ্ছে। শনিবার পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৬৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পাউবো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, ধীরগতিতে পানি নামায় বাঁধগুলো এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। ধর্মপাশার চন্দ্রসোনারথাল ও দিরাই উপজেলার টাংনির হাওরের বাঁধ নতুন করে বন্ধ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, পাউবো ও স্থানীয় লোকজনের টানা পরিশ্রমের ফলে বাঁধগুলো আগের মতো করা সম্ভব হয়েছে। চেরাপুঞ্জিতে নতুন করে বৃষ্টি না হলে হাওর নিয়ে আর দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু আজ রোববার ও সোমবার চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে আমরাও নতুন করে আতঙ্কিত অবস্থায় আছি।

পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এস এম শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢলের পানিতে মোট ৩ মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। গত কয়েক দিনে ১ দশমিক ০৭ মিটার পানি কমেছে। পানি কমতে থাকায় কৃষক ভাইরাসহ আমরা আশাবাদী হয়ে উঠেছি। কাল থেকে আবারও চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। এই বৃষ্টি হলে তো আবারও সমস্যা দেখা দেবে।

প্রসঙ্গত, জেলার বৃহৎ ৩৬টিসহ মোট ১৫৪টি হাওরের ফসল রক্ষায় চলতি অর্থ বছরে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করছে। ৭২২টি পিআইসির মাধ্যমে জেলার ১১টি উপজেলায় বাঁধের কাজ শুরু হয়। এজন্যে ১২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় পাউবো। জেলায় হাওররক্ষা বাঁধ বা ডুবন্ত বেড়ি বাঁধের মোট পরিমাণ ১ হাজার ৬৮০ কিলোমিটার।

শেয়ার করুন