১৭ ডিসেম্বর ২০১৭


একাত্তরের যন্ত্রণা আজো কাঁদায় এসনু বেগমকে

শেয়ার করুন

জকিগঞ্জ প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর কাছে সভ্রম হারিয়েছেন লক্ষাধিক মা-বোন। তেমনি একজন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বীরাঙ্গনা এসনু বেগম।

২০১৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি জকিগঞ্জের একমাত্র বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা। ২০১৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৩টি তালিকার প্রথম তালিকার ছয় নম্বরেই রয়েছে তাঁর নাম। তিনি উপজেলার বারহাল ইউনিয়নের মনতইল গ্রামের মৃত ময়গুন বেগম ও রিয়াছদ আলীর মেয়ে। এখন তাঁর বয়স প্রায় ৬০ বছর।

বিজয়ের ৪৭ বছরপূর্তি নিয়ে বীরাঙ্গনা এসনু বেগমের সাথে কথা বললে, তিনি তাঁর দুর্বিষহ জীবনের কষ্টের বর্ণনা দিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। একাত্তরের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মা-বাবার সংসারে তিনি ছিলেন একা। দুই বোন লেবু বিবি ও লেচু বিবির বিয়ে হয়ে যায় যুদ্ধের আগেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ১৩-১৪ বছরের কিশোরী। শুধু নিজ গ্রাম নয়, আশপাশ গ্রামেও তার মতো সুন্দরী মেয়ে কম ছিল।

এ কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তাঁর উপর। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে একদিন গভীররাতে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তাদের বাড়িতে হানা দেয় পাকবাহিনী। চোখমুখ বেঁধে নিয়ে যায় শাহগলি বাজারস্থ পাকিস্থানি বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখান থেকে তাকে জকিগঞ্জ শহরের ক্যাম্পে নিয়ে ক্যাপ্টেন বশারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

জকিগঞ্জ শহরের ক্যাম্পে টানা তিনদিন এসনুর উপর পাকিস্থানী অফিসাররা ও স্থানীয় রাজাকাররা নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের পর এসনু বেগমকে শাহগলীতে নিয়ে পৌঁছে দেয় হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। বীরাঙ্গনা এসনু বেগম এখনো সেই দিনগুলির পাশবিক নির্যাতনের কথা মনে হলে আৎকে উঠেন।

পাক বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার কারণে এসনু বেগমের দীর্ঘদিন বিয়ে হয়নি। স্বাধীন দেশে অনেক উপহাস-গঞ্জনাও তাকে সইতে হয়েছে। এক সময় একই গ্রামের দিনমজুর বৃদ্ধ জমির আলীর সাথে বিয়ে হয় এসনু বেগমের। বিয়ের কিছুদিন পরই মারা যান এসনু বেগমের স্বামী জমির আলী। নিঃসঙ্গ এসনুর সামান্য এক টুকরো জমি ও জীর্ণশীর্ণ একটি ঘর ও একটি কন্যা সন্তান ছাড়া আর কিছুই নেই। একাত্তরের বীরাঙ্গনা এসনু বেগমকে এখনো একাত্তরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাড়া করে। জীবন সায়াহ্নে এসেও সেই পৈশাচিকতার বিচার চান এসনু বেগম।

মুক্তিযোদ্ধা এসনু বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণশীর্ণ ঘর, দরজা জানালা ভাঙ্গা, ভাঙ্গাচোরা বাঁশের বেড়া, ঘরের ভিতর একটি কাঠের চৌকিতে অগোছালো বিছানা। এরই মাঝে তাঁর বসবাস। প্রায় ১৭ বছর পূর্বে বাবা এবং প্রায় ১১ বছর আগে তার মা মারা যান। বৃদ্ধ অসহায় এসনু বেগম দু’মুঠো ভাত যোগাড় করতে শীতলপাটি ও বাঁশ দিয়ে ডাম, চাটাই ইত্যাদি তৈরি করেন। অভাব তাকে নিয়মিত তাড়া করলেও কোনদিন কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি।

এসনু বেগম বলেন, ২০১৬ সালে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু অন্য কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি ঝুপড়ি ঘরে এখনো বাস করেন মুক্তিযোদ্ধা খেতাবপ্রাপ্ত এসনু বেগম। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তার খোঁজখবর নিতে কেউ আসেননি। তিনি জীবনের শেষ সময়ে একটি ভালো ঘরে বসবাস করে মরতে চান। কিন্তু কবে তার স্বপ্ন পূরণ হবে তা নিয়ে তিনি অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযুদ্ধা কামান্ডার ও পৌর মেয়র মুক্তিযোদ্ধা খলিল উদ্দিন জানান- মুক্তিযোদ্ধা এসনু বেগমের বসতঘর তৈরি করে দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ প্রেরণ করা হয়েছে।

(আজকের সিলেট/১৭ ডিসেম্বর/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন