১ এপ্রিল ২০২২


সাওম, রামাদান ও কুরআন

শেয়ার করুন

সালমা খানম : আর মাত্র একদিন পরেই শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র রমযান মাস। শুক্রবারের আমল সাথে নিয়েই আমরা রমযান মাসের পরিপূর্ণ আমলের প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। এই সৌভাগ্য পরম করুণাময়ের কৃপাতেই লাভ। এক নজরে রমযানের আমল, গুরুত্ব ও ফজিলত মিলিয়ে নেওয়ার আজই যথার্থ দিন।

রমযান মাস মহিমান্বিত মাসের মর্যাদা লাভ করেছে।কারণ, এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে ক্বদরের রজনীতে। এই মাসের সম্মানে এবং মানুষকে সুযোগ প্রদানের অভিপ্রায়ে আল্লাহ মানুষের প্রধান শত্রু শয়তানকে বন্দী করে ফেলেন রমাদানের চাঁদ উদিত হবার সাথে সাথেই। যেনো আমরা আমাদের যাবতীয় ইবাদত সঠিকভাবে পালন করে আমাদের গোনাহ মওকুফ করে নিতে পারি।

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হচ্ছে রমজান মাসের রোজা। সূরা আল বাকারার ১৮৫ নং আয়াতের দ্বারা দ্বিতীয় হিজরীতে রমজানের রোজা উম্মতের উপর ফরজ করা হয়েছে। তাই রমজানের রোজাকে কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,” হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হলো,যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” ( সূরা আল বাকারা,আয়াত ১৮৩।)

আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেন, “রমযান উপস্থিত হলেই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, এই মাস তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েই গেল। এই মাসে এমন একটি রাত্রি রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। যে ব্যক্তি ঐ রাত্রির সওয়াব থেকে বঞ্চিত হল, সে যেন সর্বপ্রকার কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত থেকে গেল। আর একান্ত চিরবঞ্চিত ছাড়া ঐ রাত্রির কল্যাণ থেকে অন্য কেউ বঞ্চিত হয় না।”

এখন প্রশ্ন আসে, সাওম কী?

সাওম আরবী শব্দ। এর অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় প্রভাত (সুবহে সাদিক) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত নিয়তের সাথে আল্লাহর ইবাদত ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার ও অন্যান্য ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার নামই হল সাওম বা রোযা।

আত্মার পরিশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতি, মানবিক মমত্ববোধের বিকাশ, তাকওয়া ও সততা অর্জনের জন্য সকল যুগের সকল বিশ্বাসী মানুষের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলো সাওম।

রমজানের রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, আবার এর প্রতিপালনের উপর অনেক বড় পুরস্কারেরও ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ্ তাআলা বলেন: রোজা আমারই জন্য। আমি নিজে এর প্রতিদান দেব। আমার বান্দা আমার জন্য পানাহার ছেড়ে দেয়, কামনা-বাসনা ছেড়ে দেয়। রোজাদারের জন্য দু’টি খুশি। একটি খুশি ইফতারের সময়। আরেকটি খুশি আমার সঙ্গে তার সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধের চেয়েও উত্তম। (বুখারি : ৭৪৯২)

“রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচার একটি ঢাল। যেমন তোমাদের কাছে আছে হত্যা থেকে বাঁচার ঢাল।” (সহিহ ইবনে খুযাইমা : ২১২৫)

আবু উমামা বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করব। তিনি বললেন: ‘তোমার জন্য অপরিহার্য হলো রোজা রাখা। কেননা এর কোনো তুলনা নেই’। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩৪২৫)

যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখবে আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে একটি পরিখা তৈরি করে দেন। যা আকাশ ও জমিনের দূরত্বের মতো। (তিরমিজি : ১৬২৪)

জান্নাতে একটি ফটক আছে। তার নাম রাইয়্যান। কেয়ামতের দিন রোজাদারগণ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অন্য কেউ সেই ফটক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে: রোজাদারগণ কোথায়? তখন তারা উঠবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ যাবে না। যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন রাইয়্যান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হবে। সুতরাং আর কেউ এ ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি : ১৮৯৬)

রসুল মুহম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি জিনিস দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোনো নবীকেই দান করা হয়নি।

প্রথমত: রমজান মাসের প্রথম রাত যখন আসে তখন আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আর যার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে তাকে তিনি কখনো শাস্তি দেবেন না।
দ্বিতীয়ত: তাদের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুবাসের চেয়েও উত্তম।তৃতীয়ত: ফেরেশতারা তাদের জন্য প্রত্যেক দিন ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।
চতুর্থত:আল্লাহ্ তাআলা জান্নাতকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি আমার বান্দাদের জন্য তৈরি হও এবং সজ্জিত হও। অতি শীঘ্রই তারা দুনিয়ার ক্লান্তি থেকে আমার ঘরে ও আমার সম্মানে স্বস্তি চাইবে।
পঞ্চমত: যখন শেষ রাত আসে তখন তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

একজন জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি কদরের রাতে? তিনি বললেন, না। তুমি কি মজদুরদের দেখোনি যে, তারা যখন কাজ থেকে অবসর পায়, তখন তাদের মজুরি পুরোপুরি প্রদান করা হয়। (কানযুল উম্মাল)।

প্রসঙ্গত বলে নেয়া ভালো যে,ফজিলতের দিক দিয়ে রমযান মাসকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশ রহমতের, দ্বিতীয় অংশ মাগফিরাতের এবং শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার।

সাওম বা রোযা ছয় প্রকার। যথা: ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, নফল ও মাকরূহ রোযা।

১/ ফরজ রোযা
রমযান মাসের রোযা। রমজানের রোযা কাযাও ফরজ। বিনা ওজরে এ রোযা ত্যাগকারী ফাসিক ও গুনাহগার হবে
২/ ওয়াজিব রোযা
যে-কোনো নির্দিষ্ট দিনে মানতের রোযা
৩/ সুন্নত রোযা
আশুরা ও আরাফার দিনে রোযা পালন
৪/ মুস্তাহাব রোযা
চন্দ্র মাসের ১৩,১৪, ১৫ এবং শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা
৫/ নফল রোযা
ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব ছাড়া সকল প্রকার রোযা
৬/ মাকরুহ রোযা
ক. মাকরুহ তাহরিমি, যা হারাম। যথা: দুই ঈদের দিনে ও জিলহজ মাসের চাঁদের ১১,১২ ও ১৩ তারিখে রোযা পালন করা।
খ. মাকরূহ তানযিহি, যেমন:মুহররম মাসের ৯ বা ১১ তারিখে রোযা পালন না করে শুধু ১০ তারিখে পালন করা।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক তাকওয়ার সাথে সাওম পালনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

শেয়ার করুন