১৩ মার্চ ২০২২
অতিথি প্রতিবেদক : বর্ধিত সময়েও সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় হাওরপারের কৃষকরা ফুঁসে উঠছেন। কষ্টার্জিত ফসল রক্ষায় তারা গতকাল শনিবার সুনামগঞ্জ শহরে পালন করেছেন মানববন্ধন কর্মসূচি। ফসল ডুবি হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও ডিসি অফিস ঘেরাও এর মতো কঠোর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, এখনো মাটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। শুধু মাটির কাজ শেষ হলে পুরো কাজের ৬৫ ভাগ হয়। বাকী কাজ এখনো হয়নি। বিশেষ করে ক্লোজারগুলো এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এজন্যে হাওরের ফসল রক্ষায় আমরা উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন কৃষককূলও। পিআইসিকে এখনো তৃতীয় কিস্তির টাকা দেয়া হয়নি। টাকা না পেলে তারা কিভাবে কাজ করবেন।
সুনামগঞ্জ পাউবোর (পওর বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুদ্দোহা জানান, তৃতীয় কিস্তির টাকা দিতে প্রায় ৩ সপ্তাহ আগে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো টাকা ছাড় দেয়া হয়নি। টাকা ছাড় না দেয়ায় আমরাও টাকা দিতে পারছি না। ছাড় হওয়া মাত্রই টাকাগুলো পিআইসির নিকট বিতরণ করা হবে।
আর বাঁধ নির্মাণ কমিটির সভাপতি ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, সবক’টি বাঁধের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। ঘাস লাগানোসহ আনুষাঙ্গিক কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও এগুলো কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
পাউবোর দেয়া তথ্য মতে, চলতি অর্থ বছরে জেলার বৃহৎ ৩৬ টিসহ মোট ১৫৪ টি হাওরের ফসল রক্ষায় চলতি অর্থ বছরে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো। ৭২২ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসির মাধ্যমে জেলার ১১টি উপজেলায় বাঁধের কাজ শুরু হয়। এজন্যে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ চাওয়া হয় ১২২ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ২৬টি পিআইসি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ৩৩টি পিআইসি, ধর্মপাশা উপজেলায় ১৫৭টি পিআইসি, তাহিরপুর উপজেলায় ৬৮টি পিআইসি, জামালগঞ্জ উপজেলায় ৪০টি পিআইসি, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্প ৫৬টি পিআইসি, দিরাই উপজেলায় প্রকল্প ১০৪টি পিআইসি, শাল্লা উপজেলায় প্রকল্প আছে ১৩৮টি পিআইসি, জগন্নাথপুর উপজেলায় প্রকল্প ২৮টি পিআইসি, দোয়ারাবাজার উপজেলায় প্রকল্প ৫০টি পিআইসি, ছাতক উপজেলায় ২২টি পিআইসি বাঁধ নির্মাণ, পুনঃ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করছে। সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর রক্ষা বাঁধ বা ডুবন্ত বেড়ি বাঁধের মোট পরিমাণ ১ হাজার ৬৮০ কিলোমিটার।
সূত্র জানায়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শতভাগ সম্পন্নের কথা। কিন্তু শতভাগ কাজ শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পরও আরও ১০ দিন বৃদ্ধি করে জেলা বাঁধ নির্মাণ কমিটি। গত বৃহস্পতিবার এই ১০ দিনও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বাঁধের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় হাওরপারের কৃষকগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। উদ্বিগ্ন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দও। এ নিয়ে গতকাল শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের ট্রাফিক পয়েন্টে বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির উদ্যোগে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি সকল হাওরের বাঁধের কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কাজ শেষ না করে পাউবো ও সংশ্লিষ্টরা আরও ১০ দিন বর্ধিত করেন। এই বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের কাজের অগ্রগতি ৮৩ ভাগ বললেও বাস্তব অবস্থার সাথে এর মিল নেই। ফসলের সুরক্ষা নিয়ে কৃষকরা চিন্তিত রয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় অনেক হাওরের ফসল অরক্ষিত রয়েছে। তাদের গাফিলতির কারণে হাওর ডুবির ঘটনা ঘটলে ২০১৭ সালের মতো আবারও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের সাথে নিয়ে পাউবো অফিস ও ডিসি অফিস ঘেরাও করা হবে বলে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
লুটপাটের মাধ্যমে বাঁধের টাকা আত্মসাত করা হলে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সংগঠনের সুনামগঞ্জ জেলার কার্যকরী সভাপতি অলিউর রহমান চৌধুরী বকুলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনের পরিচালনায় এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়। এতে হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি সুখেন্দু সেন, যুগ্ম সম্পাদক নির্মল ভট্টাচার্য্য ও সালেহিন চৌধুরী শুভ, সাংগঠনিক সম্পাদক একে কুদরত পাশা, সুনামগঞ্জ জেলা সহ সভাপতি আলী হায়দার, মোদাচ্ছির আলম সুবল, সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদনুর আহমদ, শান্তিগঞ্জ উপজেলার যুগ্ম সম্পাদক জিয়াউর রহমান, বাঁধ বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম, তাহিরপুর উপজেলার সদস্য সচিব হোসাইন শরীফ বিপ্লব, কৃষক আব্দুল আজিজ, মিনার মিয়া, জয়নাল মিয়া, জগলুল মিয়া, জিতু মিয়া প্রমুখ বক্তব্য দেন।
পাউবো জানায়, কৃষক ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে ৫ থেকে ৭ সদস্যের একটি পিআইসি গঠন করা হয়। একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। হাওরে বাঁধ নির্মাণ কাজের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে একটি পিআইসি।