১১ মার্চ ২০২২
ডেস্ক রিপোর্ট : কেবিনের সামনে দায়িত্বরত প্রহরী পরিচয় জেনে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। কেবিনে ঢুকে দেখা গেল সোফায় বসে আছেন সিলেটবাসীর অভিভাবক, সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ আবুল মাল আবদুল মুহিত। সুনসান নীরবতা।কেবিনের ভেতরে থাকা কমফোর্টেবল সোফায় বসে আছেন তিনি। ছোট ভাই আব্দুল মুহিত সুজন ও বোন শিপা হাফিজা আছেন তাঁর দেখভালের জন্য। সিলেটবাসীর কেউ দেখতে গেলে যেনো তিনি ডুবে যান আধ্যাত্মিক রাজধানীর মায়াজলে। এভাবেই কাটছে সময়। এমনই সময় কেবিনের সামনে হাজির চারজন সিলেটি।
দীর্ঘদিন থেকে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত তিনি। করোনাক্রান্ত ছিলেন।সুস্থ হয়েছেন।আবারও বার্ধক্যের রোগ তাকে ঘিরে ফেলেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে এখন অনেকটা সুস্থ। রাজধানী ঢাকার পান্থপথে অবস্থিত গ্রীণ লাইফ হাসপাতালের নবম তলার ৯১৮ নম্বর কেবিনে তাঁর শারীরিক খোঁজখবর নিতে গিয়ে কিছু সময় কথা হয় বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদের সাথে।
আলাপকালে সিলেটবাসীকে তাঁর স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, ‘সিলেটবাসীর জন্য অনেক স্বপ্নই তো আছে। যা করেছি তা নিয়ে ভাবি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের (পুরাতন) স্থলে সেন্ট্রাল পার্কের স্বপ্ন বুনেছিলাম। এটা বাস্তবায়ন হচ্ছে দেখলে আমি সবচেয়ে আনন্দিত হবে।’
কথাবার্তায় মনে হচ্ছে আসলেই তিনি এখন অনেকটা সুস্থতা বোধ করছেন।স্পষ্ট আওয়াজে কথা বলে যাচ্ছেন। এমন সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হল- আপনি নাকি ১৪ এপ্রিল সিলেট যাচ্ছেন। প্রতিত্তোরে তিনি বলেন, সিলেট যাওয়ার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে আছি।আমার মন চাচ্ছে সিলেটবাসীকে দেখতে।
বৃহস্পতিবার তাকে দেখতে হাসপাতালে যান সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও রেড ক্রিসেন্ট সিলেট ইউনিটের সেক্রেটারি মোঃ আব্দুর রহমান জামিল, সিসিক’র ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এস এম শওকত আমিন তৌহিদ, সাবেক ব্যক্তিগত ককর্মকর্তা কিশোর ভট্রাচার্জ্য জনি ও সাংবাদিক আতিকুর রহমান নগরী।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমিরাত সফর শেষে দেশে ফিরলে তাঁর সাথে ফোনে কথা বলে পুরাতন কারাগারে পার্ক প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি নিয়ে আলাপ করবেন বলে জানান আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় বাদাঘাটের নতুন কারাগার পরিদর্শনকালে বলেছিলেন নগরীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান বর্তমান কারাগারটিকে চিত্তবিনোদনের জন্য পার্ক হিসেবে রূপ দেওয়া হবে। এটি হবে নগরীর ফুসফুস।
উল্লেখ্য- অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষা-সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিত এডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের দ্বিতীয় পুত্র। তার মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মুহিত ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাশ করেন। চাকুরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস-এ (সিএসপি) যোগদানের পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব্ পালন করেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। জনাব মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চীফ ও উপ-সচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এই বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউণ্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২-৮৩ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। লেখক হিসেবে মুহিত সমান পারদর্শী। প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তার ২১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।