১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২
লাইফস্টাইল ডেস্ক : প্রকৃতির রূপের পূর্ণতায় নতুনমাত্রা যোগ করতে প্রতিবছর আসে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্তের শুরুর দিনটা এবার আসছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের রঙে রাঙাতে। কবি গুরুর সেই কবিতার মতো হয়তো এখন আর বসন্ত টের পাওয়া যায়না বন্ধ বাতায়নের অন্দরে। যান্ত্রিক শহরে আর কোকিলের কুহু ডাক শোনা যায়না। প্রিয়জনকে বছরের এই বিশেষ দিনে অনেকেই চমকে দেয় প্রিয় কোনো উপহারে। বাগানে ফুল না ফুটলেও রাজধানীর শাহবাগের ফুলের দোকানের ভিড় আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আজ বাসন্তির ভ্যালেন্টাইন। আলো আঁধারের ভালোবাসা দিবসে আলোর বিপরীতে অন্ধকারও থাকে অজানা।
জেনে নেয়া যাক ভালোবাসা দিবসের সাতসতেরো-
প্রেয়সীর সাথে রঙিন মুহূর্তের স্মরণীয়তায় ভ্যালেন্টাইন’স
আপনি যদি কাউকে ভালোবেসে থাকেন তবে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আপনার জন্য নিঃসন্দেহে বিশেষ কিছু। আপনার কাছে নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবের পরেই বেশি গুরুত্ব পায় নিশ্চই ভালোবাসা দিবস। এটাই হওয়া উচিত সকল প্রেমিকের কাছে। কারণ এ দিনটা একান্তই আপনার। নিজের মতো করে সময় কাটানোর দিন প্রিয়জনের সাথে। একটা দিন বিশেষভাবে প্রিয়জনের সাথে ভাগ করে নেয়া, একসাথে ঘুরতে বের হওয়া, অন্তত পক্ষে ভালো একটা নৈশভোজ দিনটাকে আরো স্মরণীয় করে তোলে। ২০২২ সালের ৩৬৫ দিনের মধ্যে অন্তত এই দিনটা আপনার প্রিয়জনের জন্য উৎসর্গ করার মতো হওয়া উচিত বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না।
দিনটা হতে পারে আপনাদের বিশেষ পছন্দের কাজের মাধ্যমে
ভালোবাসার মানুষকে চাইলেও বছরের প্রতিটা দিন আপনি সমানভাবে বিশেষ কিছু দিতে পারবেন না। আপনার পছন্দগুলো আপনার সঙ্গী হয়তো বছরের বাকি দিনে মেনে নেয় না, কিন্তু একটা দিন দুজনে কিছুটা ত্যাগ করে দারুণ মুহূর্ত কাটাতে পারেন যা আপনাকে বাকি দিনের জন্য প্রেরণা জোগাবে। আপনি হয়তো প্রতিদিন প্রিয়তমার জন্য ১০০ গোলাপ সম্বলিত তোড়া উপহার দিতে পারবেন না। কিন্তু ভ্যালেনটাইনসের দিনটা বিশেষ করে রাখতে এতটুক অতিরিক্ত খরচ করা যেতে পারে। আপনার প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রতিদিনকার একঘেয়েমি রান্না থেকেও এই দিনটায় মুক্তি পেতে পারেন।
আপনার সঙ্গী একাই পরিবারের অভাব থেকে মুক্তি দিতে পারে
কথাটা শুনতে হয়তো একটু শ্রুতিকটু লাগতে পারে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। আমরা সময়ের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। হয়তো একটা সময় গিয়ে নিজেই ছোট একটা পরিবার গঠন করি। পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষের কাছে প্রিয়জন বিশেষ কিছু। বছরের বাকি দিন যে আপনাকে দেখেশুনে রাখে একটা বিশেষ দিন তাকে উপহার দিন।
ভ্যালেনটাইনসের ভালোদিকের থেকে বর্তমানে নেতিবাচক দিকটাই বেশি প্রখর। আজকালকার ভ্যালেন্টাইনস ভালোবাসার চাইতে কর্পোরেটই বেশি। ভালোবাসা আজকাল ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। ভ্যালেনটাইনস সংস্কৃতিটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে বিজাতীয় সংস্কৃতি। কিন্তু এটা মরণব্যাধি ক্যানসারের সর্বশেষ ধাপের আকার ধারণ করেছে। চাইলেই এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ আশা করে ভালোবাসা দিবসে কেউ তাদের জন্য গড়ে ১৬২ ডলার খরচ করবে। একজন পুরুষের থেকেই এই ব্যয়টা সবাই আশা করে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় অন্য একটি জরিপে যেখানে দেখানো হয়েছে একজন পুরুষ গড়ে ২৩০ ডলার খরচ করে ভালোবাসা দিবসে। যেখানে নারীরা করে গড়ে মাত্র ৯৮ ডলার!
রেস্টুরেন্ট মালিকদের এক জরিপে দেখা গেছে, ভ্যালেনটাইনসের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ৪০ শতাংশেরও বেশি বুকিং দেওয়া হয়ে যায়। জরিপটা আমাদের দেশের না হলেও কিছুটা মিল খুঁজে পেতে পারি। ঢাকাসহ সারা দেশের রেস্টুরেন্টগুলোর চিত্র নিশ্চই জরিপের তথ্য নিয়ে আশাহত করবে না।
উচ্চাভিলাষী অভিশাপ
ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে আমাদের আকাঙ্ক্ষা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বছরের একটি দিনের অজুহাতে হয়তো প্রিয়জনের কাছে সাধ্যের বাইরে গিয়ে আবদার করে ফেলি। ভালোবাসা দিবসে দম্পতিদের মাঝে উপহার, অভিনব নৈশভোজ থেকে শুরু করে চিরস্থায়ী প্রেম আর রোমান্সের ধারণায় আজকাল প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। এই ভ্যালেন্টাইনস ঘিরে অতিরিক্ত চাপ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ব্রেকাপ স্ট্যাটাস ট্রেকিং এর মাধ্যমে দেখা গেছে, ভালোবাসা দিবসে অনেক দম্পতির বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সাইকোলজি টুডের এক গবেষণা বলছে, আমাদের হতাশা তৈরিতে উচ্চ প্রত্যাশার ভূমিকা বেশি, বিশেষ করে যে প্রত্যাশাগুলো একদিনের জন্য স্থায়ী হয়।
ভ্যালেন্টাইনস ডে আসলে বেশ কিছু ভয়ঙ্কর গল্প থেকে উদ্ভূত। এনপিআর অনুসারে, প্রাথমিকভাবে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ছিল যখন লুপারকালিয়ার রোমান উর্বরতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যেখানে পুরুষরা একটি ছাগল এবং কুকুর বলি দিয়েছিল এবং মহিলাদের উর্বরতা বাড়ানোর আশায় মৃত পশুর চামড়া দিয়ে মহিলাদের চাবুক মেরেছিল৷ যদিও ভিন্নমতে আছে তৃতীয় শতাব্দীতে ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ভ্যালেন্টাইন নামের একজন পুরোহিতের মৃত্যুদণ্ড থেকে `ভ্যালেন্টাইনস ডে‘ নামকরণ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব
ভালোবাসা দিবসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সুখি দম্পতির ছবি শেয়ার করতে দেখা যায়। এটা হয়তো অনেকের কাছে বিভ্রান্তির বা হতাশার জন্ম দেয়। মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই তুলনা করতে পছন্দ করে। অন্য দম্পতির সাথে যখন কেউ নিজেকে তুলনা করে তখন বেশ অমিল মনে হয়। মনে হয় আমাদের চেয়ে তারা বেশি সুখি। এই মানসিকতা ধ্বংসাত্মক এবং বিভ্রান্তিকর উভয়ই হতে পারে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব
২০০৫ সালে অক্সফামের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভালোবাসা দিবসের কাছাকাছি সময়ে সোনার গয়না বিক্রি থেকে ৩৪ মিলিয়ন টন খনিজ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ভ্যালেন্টাইনসকে স্বর্ণ শিল্পের বিপদ সম্পর্কে লোকেদের শিক্ষিত করার একটি উপায় হিসেবে দেখেন।
বিশ্ব সম্পদ ইনস্টিটিউট অনুসারে, ফুল উপহার দেওয়ার পিছনে নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে। যেহেতু গাছ থেকে ছেড়া ফুলের ওপর প্রাকৃতিক পরিবেশের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ নেই তাই শস্যে ব্যবহারে চেয়ে এই ফুলের জন্য কৃষি রাসায়নিকগুলি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় যেগুলো বায়ু, মাটি এবং পানিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।