৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২
দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : গত বৃহস্পতিবার তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত থেকে ১২জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর লাশ উদ্ধার করেছে তুরস্কের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। দেশটির এর্ডিনা প্রদেশের ইপসালা গ্রামে ঠান্ডায় জমে পড়েছিল লাশগুলো। ২২ জনের অভিবাসনপ্রত্যাশীর একটি দল গ্রিসের সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছিল। অভিবাসনপ্রত্যাশীর ওই দলটিতে ছিল সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তিন যুবক।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ হলে যুবকদের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। কিছু সূত্র থেকে নিখোঁজ তিন যুবকের মৃত্যু হয়েছে এমন সংবাদ পাওয়া গেলেও নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। প্রিয় সন্তানদের খোঁজ পেতে পাগলপ্রায় পিতা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন।
নিখোঁজ যুবকদের পরিবারের লোকজন জানান, গত ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের টুক দিরাই গ্রামের বাসিন্দা আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য এনামুল হকের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বাড়ি ছাড়েন দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের সাকিতপুর গ্রামের ফুল মিয়া সরদারের ছেলে জনি সরদার (৩৪), নতুন কর্ণগাঁও গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে জুনেদ আহমেদ (২২) ও শাল্লার আনন্দপুর ইউনিয়নের আশুতোষ রায়ের ছেলে আকাশ রায় (২৫)।
আকাশ রায় দিরাই উপজেলার কল্যাণী গ্রামের বাসিন্দা ও দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী বিধান রায়ের ভাগ্নে। মানবপাচারকারী এনামুল হক ওই যুবকদের দুবাই, ইরান, তুরস্ক হয়ে গ্রিসে পৌঁছে দেয়ার কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশ থেকে দুবাই ২ লাখ টাকা, দুবাই থেকে ইরান ৩ লাখ টাকা, ইরান থেকে তুরস্ক ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও তুরস্ক থেকে গ্রিস পর্যন্ত আরও সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেয় পাচারকারী এনামুল।
নিখোঁজ যুবক জুনেদ আহমেদের পিতা লাল মিয়া বলেন, আমার ছেলেকে দুবাই-ইরান হয়ে তুরস্ক পৌঁছায় এনামুল। গত ৩১ জানুয়ারি সোমবার আমার ছেলের সাথে শেষবার কথা হয়। তুরস্ক থেকে এনামুলের লোকজন গাড়িতে করে গ্রিসে পৌঁছে দিবে জানিয়ে আমার ছেলে এনামুলের টাকা দিয়ে দিতে বলে। ওইদিনই দিরাই বাজারে বিধান রায়ের দোকানে বসে আমার ছেলে জুনেদ ও বিধান রায়ের ভাগ্নের তুরস্ক থেকে গ্রিসে পৌঁছে দেয়া বাবদ সর্বশেষ চুক্তির মোট ৭ লাখ টাকা আমি ও বিধান বাবু এনামুলের ভাগ্নে শাহজাহান-এর হাতে তুলে দেই। এরপর থেকে আমার ছেলের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। দালাল এনামুল প্রথমে আশ্বাস দিলেও এখন তার সাথে কথা বলতেই পারছি না।
হাইমাউ করে কেঁদে তিনি বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জেনেছি- আমার ছেলে নাকি মারা গেছে। যদি মারা গিয়েই থাকে তবে তার লাশটা ফিরে পেতে সরকারের কাছে হাতজোড় করে মিনতি জানাই।’
ব্যবসায়ী বিধান রায় বলেন, ‘গত সোমবারের পরে আমার ভাগ্নের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। মৃতদের যে ছবি দেখা গেছে সেখানে আমার ভাগ্নে নেই। এনামুল জানিয়েছে, বর্ডারে সবাই মরেনি। কিছু লোক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে। আমার ভাগ্নে হয়তো সেখানে থাকতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানাবে বলেছে।’
এদিকে, সাকিতপুর গ্রামে ফুল মিয়া সরদারের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। কিছু পত্রিকায় ইতিমধ্যে ফুল মিয়া সরদারের ছেলে জনি সরদারের মৃত্যু সংবাদ ছাপা হয়েছে। তবে তিনি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। দালাল এনামুলও স্পষ্ট কিছু বলছে না জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার টুকদিরাই গ্রামের হাজি আব্দুল ওয়াহেদ মিয়ার ছেলে এনামুল হক একসময় ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হঠাৎ তিনি ঢাকা-সিলেট আসা-যাওয়া করে এলাকার যুবসমাজকে ইউরোপ পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচার শুরু করেন। স্বপ্নের ইউরোপ পাড়ি দিতে লাখ লাখ টাকা নিয়ে এনামুলের শরণাপন্ন হয় এলাকার অনেকে। দীর্ঘদিন অবৈধভাবে মানবপাচার করে কোটিপতি হয়ে ওঠেন এনামুল। সিলেট শহরে বাড়ি-গাড়ি করেন এনামুল। এনামুলের প্রলোভনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ স্বপ্নের ইউরোপ পাড়ি দিলেও অনেকের সলিল সমাধি হয়েছে ভূমধ্যসাগরে কিংবা কাঁটাতারের সীমান্তে। কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে লিবিয়া-ইরান-তুর্কি থেকে দেশে ফিরছে, কেউ বা জেল খেটেছে। মানব পাচারকারী এনামুলের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে এরআগে ভূমধ্যসাগরে ডুবে প্রাণ গেছে দিরাই পৌর সদরের চন্ডিপুর গ্রামের মাহবুবুল করিমের।