১৭ ডিসেম্বর ২০২১
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশ যখন বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে তখন সিলেটের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমিটি যেন এক দুঃখের কারণ হয়েছে সিলেটবাসীর। সে সময় শহীদের রক্তে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ‘বাঘমারা’ নামক এলাকার মাটি লাল হয়ে যাওয়ায় নাম পরিবর্তন হয়ে ‘লালমাটিয়া’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও আজও স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোন উদ্যোগ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন জায়গা অধিগ্রহণের জটিলতায় আটকে আছে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ।
সরেজমিনে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শিববাড়ির নিকটবর্তী লালমাটিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা মধ্যখান দিয়ে বয়ে চলা রেললাইনের উভয় পাশে অরক্ষিত বধ্যভূমিটিতে ঝোপ-জঙ্গল আর কচুরিপানায় ভরা। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, রেললাইনের উভয় পাশে রক্তের হোলি খেলায় মেতেছিল পাকবাহিনী। মাটি তুলে সড়কের পাশ কিংবা রেল লাইনের উভয় পাশে ভরাট করার কারণে অধিকাংশ জায়গায় এখন জলাশয়। প্রথমে শিববাড়ি থেকে ফেঞ্চুগঞ্জের দিকে এগোতে লালমাটিয়া নামক এ জায়গাটিতে সড়কের বাম পাশে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থাকলেও পরে সড়কের ডান পাশে স্থানান্তর করা হয়। এসময় দেখা যায়, সড়কের বাম পাশে বিজয় নিশান উড়ানোর জন্য পরিষ্কার করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সে সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী জামাল উদ্দিন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় ১৯৮৯ সাল থেকে এ জায়গাটিকে এককভাবেই জামাল উদ্দিন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন। বিজয় দিবস এলেই ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে উড়ান লাল সবুজের পতাকা।
জামাল উদ্দিন বলেন, প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি তেমন একটা বুঝে উঠতে না পারলেও মে মাসের শেষের দিকে একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখেন বাড়ি থেকে সামান্য অদূরে একটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। কৌতুহলবশত শিশু জামাল উদ্দিন দুপুরের দিকে দূর থেকে দেখার চেষ্টা করেন ক্যাম্পটি। এমন সময় দেখেন পাথরনির্মিত সড়ক দিয়ে সাইরেন বাজিয়ে একটি লাল রঙের জিপ এসে দাঁড়ায় মূল সড়কে। এর খানিক পর কাঠের তৈরি একটি বাসগাড়ি এসে থামে। গাড়ির ভেতরে অনেক মানুষ। এবার শুরু হয় এক এক করে গাড়ি থেকে নামানো। এ দলে ছিলেন প্রায় ৭ জনের মতো নারী ও দুই নারীর কোলে ২ শিশু। সকলকে নামানো হলে এখান থেকে এক তরুণীকে ক্যাম্পের ভেতর নেয়া হয়। বাকি প্রায় ৩০ জনের মতো মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এরপর লাল জিপের ভেতর থেকে কেউ একজন নেমে কথা বলে চলে যান। পরে শুরু হয় ব্রাসফায়ার। মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মানুষগুলো। কেবল একটি শিশু বেঁচেছিল। শিশুটিকে মাটি থেকে তুলে আবার ছুঁড়ে মারা হয় একটি গর্তে। এ থেকে শুরু জামাল উদ্দিনের জঘন্য এ হত্যাদৃশ্য দেখা। এরপর দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।
যুদ্ধের পর সকলের মত তিনিও ভুলে যান সকল কিছু। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপলব্ধি বাড়ে জামালের। এরপর ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতি বছর একাই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ এতো বছরেও জায়গাটি সংরক্ষিত না হওয়ায় তাঁর আক্ষেপ।
তবে বার বার তাগিদ দিয়েও অজানা কারণে এ বধ্যভূমিটি সংরক্ষণে কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে জানালেন সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক গুলজার খান।
অপরদিকে সিলেটের গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মোট ১১.১৯ শতক জায়গায় নিয়ে বধ্যভূমিতে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ১ কোটি, ৭৫ লক্ষ হাজার, ৯২ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েও কাজ এগোতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এমনকি সে অনুযায়ী একটি নকশাও তৈরি করা হয়েছিলো। কিন্তু বধ্যভূমির প্রকল্পের মেয়াদকাল চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হলেও কার্যক্রম কেবল খাতায় কলমে সীমাবদ্ধ।
তবে জায়গা অধিগ্রহণ জটিলতায় এর কাজ আটকে আছে জানিয়ে সিলেটের গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিপন কুমার রায় বলেন, ‘গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে জরীপ করে ইতোমধ্যে সকল প্রক্রিয়া শেষ। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদের যে জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে সেটি ব্যক্তি মালিকানায় থাকায় অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না।’