১৬ ডিসেম্বর ২০২১
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশে বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করা হয়। আর আমরা বাবা হারানোর বিষাদময় ক্ষণের ক্ষত নিয়ে দিনটি কাটাই। আমার বয়স যখন ৪ বছর তখন বাবা ঢাকায় যাওয়ার পথে গাড়িসহ নিখোঁজ হন। এরপর এক এক করে ২৬ টি বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও এখনো অপেক্ষার প্রহর গুনছি এইতো বাবা ফিরে আসবেন। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায় তবুও বাবাকে দেখতে পাইনা আমরা তিনটি ভাই।
এমন আবেগ আপ্লুত কথাগুলো বলেন ২৬ বছর আগে নিখোঁজ আব্দুল হান্নানের পুত্র শফিউল আলম সৌরভ । আব্দুল হান্নান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌরশহরের উছলাপাড়ার বাসিন্দা মৃত আব্দুস ছত্তারের বড় পুত্র।
একই সাথে আব্দুল হান্নানের গাড়ি চালক জুড়ী মনতৈল গ্রামের বাসিন্দা গিয়াস মিয়াও নিখোঁজ হন। ঘটনাটি ১৯৯৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
আব্দুল হান্নানের পরিবার সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ডে আসেন ৭ জন লোক। ফেরার পথে ওই লোকগুলো কুলাউড়ায় সন্ধ্যায় শহরের উত্তরবাজারস্থ মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডে এসে ঢাকার উদ্দেশে একটি মাইক্রোবাস ভাড়ার জন্য খুঁজেন। এ সময় হান্নানের গাড়ি চালক গিয়াস মিয়ার সাথে কথাবার্তা হয়। তাঁরা ঢাকার মালিবাগে যাওয়ার জন্য বলে। চালক গিয়াস স্ট্যান্ডে থাকা আব্দুল হান্নানকে ঢাকায় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন।
আব্দুল হান্নান ও গিয়াস মিয়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে ওই লোকদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া কথা সম্পাদন করেন। পরে চালক গিয়াসসহ হান্নান তাঁর মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-০২-৪৫৭৭) গাড়িতে ওই যাত্রীবেশী লোকদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। যাওয়া পথে হান্নান তাঁর বাড়িতে বলে যান ঢাকায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন। পরদিন চলে আসবেন। কিন্তু দুইদিন পেরিয়ে গেলেও চালকসহ আব্দুল হান্নান আর ফেরেননি।
আব্দুল হান্নানের ছোট ভাই তুতিউর রহমান জানান, আব্দুল হান্নান ও চালক গিয়াস গাড়ীসহ অপহরণ করা হয়েছে বলে ঘটনার দু’দিন পর অনুমান করা হয়। তাঁরা ফিরে না আসাতে কুলাউড়া থানায় জিডি করা হয়। জিডি নং-৬৫১, তাং-১৮.১২.১৯৯৫ এবং পরে মামলা (নং-১৫তাং-২৫/১২/১৯৯৫) দায়ের করা হয়। মামলাটি পরবর্তীতে ডিবি মৌলভীবাজারে স্থানান্তরিত হয়। ১৫ এপ্রিল ৯৬ ইং ডিবি থেকে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি নিখোঁজ দুই ব্যক্তিসহ ছিনতাইকৃত গাড়িটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সৌরভ বলেন, যে সময়টি বাবার বুকে থাকার কথা ছিল তখন বাবাকে খোঁজ করে হতাশায় দিন কেটেছে। বাবাহীন প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে। বাবার শাসন, স্নেহ ভালোবাসা ছাড়াই জীবনের অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেলো। নিখোঁজের পর মামলাও করা হয়। চাচারাও অনেক চেষ্টা করেছেন বাবার খোঁজ পেতে। মামলা শুধু প্রশাসনের একটি শাখা থেকে অন্য শাখায় স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আজও বাবার নিখোঁজের বিষয়টি রহস্যবৃত রয়েই গেলো। আমরা আর কতকাল এভাবে পথ চেয়ে থাকবো।
এদিকে, আব্দুল হান্নানের স্ত্রী রহিমা আক্তার শেফালি পথপানে আজও অপেক্ষায় স্বামী ফিরবেন। হান্নানের ভাই বোন ও সন্তানেরা আজও অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। জানতে চান তাঁদের প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন নাকি আদৌ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। হান্নান নিখোঁজের সময় তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ৭ মাস পর স্ত্রী শেফালীর গর্ভে জন্ম নেয় ছোট ছেলে পায়েল। হান্নানের ৩ ছেলের মধ্যে মাহবুব আলম রুবেল বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন। শফিউল আলম সৌরভ মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ও শাহরিয়ার আলম পায়েল কোরআনে হাফিজি শেষ করে আলিম ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
ওইদিকে জুড়ী উপজেলার মৈনতল গ্রামে গিয়ে চালক গিয়াসের পরিবারের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, এক সময় গিয়াসের পরিবার জুড়ী মনতৈল এলাকায় থাকতেন। বেশ কয়েক বছর আগে পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র চলে গেছেন। কোথায় গেছেন সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য কেউ দিতে পারেনি।
সিআইডি মৌলভীবাজার কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাশ মোবাইলে বলেন, বিষয়টি অনেক আগের। এতদিন মামলাটি পড়ে থাকার কথা না। ওই সময় দায়িত্বে থাকা তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটির প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছেন হয়তো। আদালতে বিষয়টি খোঁজ নিলে মামলার পুরো ব্যাপারটি জানা যাবে।