১৫ ডিসেম্বর ২০২১
শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : স্বাধীনতার ৫০ বছরেও শায়েস্তাগঞ্জের বধ্যভূমি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ফলে, ১৯৭১-এ পাক-বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে বহু বাঙালি শহীদ হওয়ার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই রয়ে যাচ্ছে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজ, শায়েস্তাগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার দাবি জানিয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায় জুড়ে লেখা রয়েছে বধ্যভূমি আর গণহত্যার ইতিহাস। দেশের অনেক জায়গার মতো হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেল জংশনের পাশেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার দলিল এ বধ্যভূমি এখনও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার এক শোকাবহ স্মৃতিচিহ্ন অঙ্কিত হয়ে আছে এই বধ্যভূমিতে। ওই স্থানে পাকবাহিনী লালচান চা-বাগানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ ১১ জনকে হত্যা করে গণকবর দেয়। তাদের মধ্যে শহীদ রাজকুমার গোয়ালা, লাল সাধু, কৃষ্ণ বাউরী মেম্বার, দিপক বাউরী, মহাদেব বাউরী, অনু মিয়া, সুনীল বাউরী, নেপু বাউরী, রাজেন্দ্র রায়, গৌর রায় ও ভুবন বাউরী রয়েছেন।
এই ১১জন শহীদের মধ্যে শুধু অনু মিয়াই মুসলিম ধর্মের ছিলেন, নিহত বাকি সকলেই চুনারুঘাট উপজেলার লাল চান্দ চা বাগানের বাসিন্দা ছিলেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ বধ্যভূমি রেল লাইন সংলগ্ন হওয়ায় রেল লাইন অতিক্রম ব্যতিত সেখানে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক থেকে বধ্যভূমিতে যাতায়াতের সুবিধার্থে একটি পাকা সড়ক নির্মাণ করা হলেও ওই সড়কটি এখন সিএনজি অটোরিক্সার দখলে রয়েছে। এ সড়ক দিয়ে মানুষ চলাচলের কোনো পরিবেশ নেই।
বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা তার নিজস্ব অর্থায়নে ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন। কিন্তু, বধ্যভূমিতে গড়ে উঠেনি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। শুধুমাত্র একটা সাইনবোর্ড বসানো রয়েছে। আর কয়েকটা পাকা পিলার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এখনো অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে বধ্যভূমিটি।
বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার জন্য তারকাটা দিয়ে বেড়া দেয়া হয়েছিল যার অধিকাংশই ছিড়ে ফেলা হয়েছে, ফলে এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বধ্যভূমি।
অন্যদিকে, এই বধ্যভূমির পবিত্রতা রক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ পাকা পিলার দিয়ে বধ্যভূমির সীমানা চিহ্নিত করে ঘিরে দিয়েছেন। এতে বধ্যভূমির সীমানা চিহ্নিত হলেও এর পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা নিশ্চিত হয়নি এখনো।
এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান জানান, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে এ বধ্যভূমি স্বীকৃতি পেয়েছে এবং গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বধ্যভূমি একটি আবেগ, ইতিহাসের অংশ- এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সকলের।
বর্তমানে পৌর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক ওই বধ্যভূমি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। শায়েস্তাগঞ্জের বধ্যভূমি সংস্কারের জন্য টেন্ডার হয়েছে। অচিরেই এর উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে।
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলাম জানান, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে খুবই আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল। বধ্যভূমি সংরক্ষণে আমরা ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছি। শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বধ্যভূমির ১১ জনের নাম সম্বলিত একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের অন্যান্য উপজেলার মতো শায়েস্তাগঞ্জেও বধ্যভূমির উন্নয়ন হবে।