২০ নভেম্বর ২০২১
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলায় অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামছে না। জায়গা-জমি কিংবা পূর্ব বিরোধ ও সামান্য কথা কাটাকাটিতে শুরু হয়েছে অস্ত্রের ব্যবহার। পুরুষদের পাশাপাশি এখন নারীর হাতেও দেখা যায় অবৈধ অস্ত্র। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তবে জগন্নাথপুর থানার ওসি মো. ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে আশারকান্দি ও বেতাউকা থেকে বন্দুক ও পাইপগানসহ দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইসহাকপুর থেকেও অস্ত্রসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। অস্ত্রবাজদের সন্ধানে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের খবর পেলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন ওসি।
জানা গেছে, প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সংঘর্ষ হলেই নির্বিঘ্নে অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে অস্ত্রের ব্যবহার হলেও অধিকাংশ ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধার হয়না। এমনকি অনেক সময় অস্ত্রধারীরাও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। প্রবাসীদের অর্থায়ন ও নির্দেশনা থাকায় অনেক সময় তুচ্ছ ঘটনায় দেশে অবস্থানরত স্বজনরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। এর ফলে হামলা- মামলায় যেমন হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি এর পেছনে বাদি-বিবাদি পক্ষ লাখ লাখ টাকা খরচও করছেন।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক বছরে হামলা ও সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। গত ১ নভেম্বর সোমবার রাতের আঁধারে পৌর এলাকার ইসহাকপুরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হন। ১২ অক্টোবর আশারকান্দি ইউনিয়নের শান্তির বাজারে চুলকাটা নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মজলিশপুর ও ঐয়ারকোনা গ্রামের লোকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন ৫ জন। বছরখানেক আগে বড়মোহাম্মদপুর গ্রামে সংঘর্ষকালে নাঈম নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখা যায়। নাঈমের গুলিতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে। এ সময় ওই গ্রামের এক নারীর হাতেও দেখা যায় আগ্নেয়াস্ত্র। ওই নারী আগ্নেয়াস্ত্রটি বহন করে আরেকজনের কাছে দিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে নারীর হাতে অস্ত্রের ছবিটি প্রকাশ হলে তোলপাড় শুরু হয়।
গেল মে মাসে উপজেলার কচুরকান্দি গ্রামের ফয়জুল ইসলাম ও পার্শ্ববর্তী পূর্ব বসন্তপুর গ্রামের খালিছ মিয়ার মধ্যে সরকারি জায়গা নিয়ে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আহত উজ্জ্বল চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি ১৯ মে মারা যান। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর কলকলিয়া ইউনিয়নের নাদামপুর গ্রামে দু’পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এতে আটজন গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৭ মে উপজেলার রমাপতিপুর গ্রামে প্রতিপক্ষের উপর হামলা করেন কাজল মিয়া ও তার স্বজনরা। এতে গুলিবিদ্ধসহ ১৫ জন আহত হন। গত ১৬ এপ্রিল পৌর শহরের ভবানীপুরে সংঘর্ষে মাসুম আহমদ নামের এক যুবক মারা যান। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর শ্রীধরপাশা গ্রামে বিরোধের জেরে সংঘর্ষে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে নুর আলী নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে মারা যায় মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সাব্বির আহমদ। উপজেলার বড়মোহাম্মদপুর গ্রামের রাস্তার পার্শ্বের মাত্র ৪ শতক ভূমি নিয়ে ছইল মিয়া, সাহেল আহমদ, আব্দুল কুদ্দুছ প্রমুখ ব্যক্তিদের সাথে একই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য হবিবুর রহামান হবি, রুনু মিয়া ও সানা মিয়াদের বিরোধ চলছে। গ্রামটিতে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে বেশ কয়েকবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে।
গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর গ্রামের ফয়জুল ইসলামের পুত্র মাজহারুল ইসলাম ইমরানকে হত্যার অভিযোগে ছইল মিয়ার পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। গত ২৭ মার্চ মামলার চার্জশিটও দাখিল করা হয়। কিন্তু ময়না তদন্ত রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ইমরান হত্যা মামলার পুনরায় তদন্ত করছে। গত ২৪ আগস্ট সাহেল আহমদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হামলার শিকার হন ছাতকের আনুজানি গ্রামের আত্মীয় রাসেল আহমদ ও জিয়াপুরের সুহেল মিয়া। রাস্তায় পেয়ে হবিবুর রহমান হবির লোকজন তাদের উপর অতর্কিত হামলা করে। এ ছাড়া অস্ত্রের অংশ বিশেষ উদ্ধারের ঘটনায় একটি অস্ত্র মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলা হয়েছে উভয়পক্ষের মধ্যে। প্রাণের ভয়ে কোনো ব্যক্তি এখন আর গ্রামের রাস্তায় একা বের হননা। গ্রামটিতে প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হলেও আজও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি।
গ্রামের ছইল মিয়া বলেন, যে জায়গা নিয়ে বিরোধ তা ৫৬ সালের রেকর্ড অনুযায়ী তারা মালিক। প্রতিপক্ষরা আমাদের জায়গা দখল করতে চাচ্ছে। এক বছরে কম হলেও ৬-৭ বার তারা হামলা করেছে। হবিবুর রহমান হবির নেতৃত্বে একাধিকবার গুলিবর্ষণ করা হয়েছে কিন্তু কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। হবির লোকজন দিনে দুপুরে মহড়া দেয়। ফলে গ্রামের লোকজন প্রাণভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আছেন।
হবিবুর রহমান হবি এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারি সড়কের পাশের ওই জায়গাটি খাস খতিয়ানভূক্ত। লোকজন ওই জায়গা দিয়ে বাড়ী থেকে বের হন। ছইল মিয়ারা জোরপূর্বকভাবে ওই জায়গা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ছইল মিয়া ও তার লোকজন কলেজ ছাত্র ইমরানকে হত্যা করে।
জগন্নাথপুর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানান, বড়মোহাম্মদপুরের বিষয়টি পুলিশের নজরে রয়েছে। এই গ্রাম নিয়ে সতর্ক আছে পুলিশ।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের বিরোধের কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে চাষাবাদ নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধু বড়মোহাম্মদপুর গ্রাম নয়, গত এক বছরে জগন্নাথপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে এরকম সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ সকল ঘটনায় বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়।
অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযান শুরু
এদিকে, জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। গত ১৪ নভেম্বর রোববার ভোররাতে উপজেলার সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের আটঘর গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী জিলু মিয়ার বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে মো. আব্দুল গফুরের পুত্র আরশ আলীকে (৪৩) একটি পুরাতন একনলা বন্দুকসহ গ্রেফতার করা হয়।
সহকারী পুলিশ সুপার (জগন্নাথপুর সার্কেল) শুভাশীষ ধর ও জগন্নাথপুর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানটি চালানো হয়। থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই জিন্নাতুল ইসলাম তালুকদার, এসআই মির্জা শাফায়েতসহ একদল পুলিশ ওই অভিযানে অংশ নেন। পরে বন্দুকসহ গ্রেফতারকৃত আরশ আলীকে সুনামগঞ্জ আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়।
উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের বেতাউকা গ্রামে গত ১২ নভেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানকালে গ্রামের মৃত মছব্বির আলীর পুত্র বকুল মিয়াকে (৩০) একটি দেশীয় তৈরি পাইপগান ও এক রাউন্ড কার্তুজসহ গ্রেফতার করা হয়। থানার এসআই মির্জা শাফায়েত-এর নেতৃত্বে একদল পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করেন। পরদিন শনিবার বকুল মিয়াকে সুনামগঞ্জ আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
গত ১ নভেম্বর জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ইসহাকপুরে দু’পক্ষের সংঘর্ষের পর নুর আলম, ফারুক আহমদ, সুজন মিয়া, আলী নুর, শাহ আলম, জাকির আহমদ, সিজিল উল্লাহ, আংগুর মিয়া, হেলাল মিয়া, রুবেল মিয়া, নজরুল ইসলাম, মনর আলী, সফু মিয়া ও আবদুল আউয়ালকে অস্ত্রসহ পুলিশ গ্রেফতার করে। পরে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।