৯ নভেম্বর ২০২১
আজকের সিলেট ডেস্ক: চালকের বিশ্রামহীন ড্রাইভিংয়ের কারণেই মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা। স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গাড়ি চালনার জন্য অধিকাংশ সময় স্নায়ুবিক সমস্যায় ভোগেন দূরপাল্লার পরিবহন চালকরা। স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালনোর কারণে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। এতে দিনে দিনেই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা।
সম্প্রতিকালের সড়ক দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, অদক্ষ ও মাদকাসক্ত চালক দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাট নির্মাণে ত্রুটি, পথচারী-সেতু ব্যবহার না করা, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা পারাপার ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুন মাসে দূরপাল্লায় চালকদের যাতে একটানা পাঁচ ঘন্টার বেশি গাড়ি চালাতে না হয় সেজন্য বিকল্প চালক রাখার নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া সড়কের পাশে বিশ্রামাগার তৈরি, সিগন্যাল মেনে চলা, অনিয়মতান্ত্রিক রাস্তা পারাপার বন্ধ, সিট বেল্ট বাঁধা এবং চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি রাত ১১টার দিকে রাজধানীর শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দুরপাল্লার বাসগুলো রাস্তার মধ্যে সারিবদ্ধ করে রাখা আছে। আবার কোনো কোনো বাস যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে।
এ সময় হানিফ পরিবহনের বাসের একজন কন্ট্রাক্টর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার বাসটি ঢাকা থেকে নীলফামারী যাবে। রাত ১১টায় বাসটি ঢাকা থেকে ছেড়ে পরদিন সকালে নীলফামারী পৌঁছাবে। পরে সেখান থেকে আবার যাত্রী নিয়ে ওই দিন বিকালে ঢাকায় ফিরবে। পরে সন্ধ্যায় ফের ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে নীলফামারী যাবে। এভাবেই বাসগুলো বিরামহীনভাবে চলতে থাকে। এক্ষেত্রে বাসের কন্ট্রাক্টর পরিবর্তন হলেও বাসের চালক অপরিবর্তিত রাখা হয়।
তিনি বলেন, একজন বাস চালক যতক্ষণ পর্যন্ত ক্লান্ত না হবেন; ততক্ষণ পর্যন্ত বাস চালাতে থাকেন। এখানে কোনো নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা করা হয় না।তিনি জানান, একজন কন্ট্রাক্টর ছয় ঘন্টা করে ১২ ঘন্টা ডিউটি পালন করেন। কিন্তু চালকরা টাকা ২৪ ঘন্টাও ডিউটি পালন করে থাকেন। পরে কয়েক ঘন্টা ঘুমের পর আবার গাড়ি চালানো শুরু করেন।
শুধু নীলফামারী নয়, রাজধানী ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দুরপাল্লার বাস চলাচল করে। ওই বাসগুলোতে চলাচলকারী যাত্রীদের অভিযোগ, চালকরা বেপরোয়াভাবে বাস চালান। এছাড়া রাতের সময় বাস চালকদের চোখে অনেক সময় ঘুম আসতে দেখা যায়। এ সময় চোখে বার বার পানি দিয়ে চালকরা জেগে থাকার চেষ্টা করেন। ঘুমের কারণে অনেক সময় চালকরা দুর্ঘটনা ঘটান।
গ্রীন লাইন পরিবহনের একজন চালক বলেন, আমি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দীর্ঘ দিন থেকে বাস চালাই। তাই প্রতিদিন দু’বার ওই সড়কে আসা-যাওয়া করি। এক বার গেলে ২৩০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া মালিক পক্ষ থেকে চালকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। এজন্য মালিক পক্ষ চালকদের সুবিধা মতো বাস চলানোর সুযোগ দেন। এতে একজন চালক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ক্লান্তি না আসা পর্যন্ত বাস চালাতে থাকেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এটার জন্য প্রধানমন্ত্রীর একটি নিদের্শনাও রয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনা বিদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়, সেখানে আইন-কানুন কতটুকু প্রতিপালিত হয় সেটা কিন্তু ভাবার বিষয়। আমি মনে করি দুরপাল্লার বাসগুলোতে বিকল্প চালক রাখার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এখনই পালন করা উচিৎ। যারা এই আদেশটি মানে নাই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, যে পরিমান পরিবহণ রয়েছে; সেই তুলনায় একজন করেও চালক নেই। চালকের অভাবে থাকায় দুইজন করে চালক নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চালকের সল্পতার কারণে এমনটা হচ্ছে। এছাড়াও অনেক সময় চালকেরা বেশি আয় করার জন্য ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালান। তবে চালক সল্পতা কাটানো হলে দু’জন করে চালক দেয়া সম্ভব।