৮ নভেম্বর ২০২১


বাস ডিজেলে চলে না গ্যাসে যাচাই করবে কে?

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : মালিকদের দাবির পর বাস ভাড়া বৃদ্ধির কথা জানালেও সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে বর্ধিত ভাড়া প্রযোজ্য হবে না বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার। তবে একই রুটের ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া কিভাবে নির্ধারণ হবে সে বিষয়টি বিআরটিএর পক্ষ থেকে খোলাসা করা হয়নি। যাত্রীর কাছে ভাড়া আদায়ে কোন বাসটি সিএনজিতে চলে আর কোনটি ডিজেলচালিত সে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণ মানুষের কাছে এ বিষয়গুলো খোলাসা না করাই বিআরটিএর সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ বিষয়ে কঠোরভাবে পদক্ষেপ না নিলে সড়কে যাতায়াতে পরিবহন চালক-শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হতে পারে।

গণপরিবহণ মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর রবিবার বিকালে বিআরটিএর চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে এটি ডিজেলচালিত বাসের জন্য। সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া প্রযোজ্য হবে না।’

তথ্য মতে, রাজধানী ঢাকায় চলা বাসের মাত্র ৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। ৯৫ শতাংশ সিএনজিচালিত। অন্যদিকে সারাদেশে চলা বাসের মধ্যে ৪৫ শতাংশ চলে ডিজেলে। বাকি ৫৫ শতাংশ চলে সিএনজিতে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘প্রথমত তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াই ঠিক হয়নি। ছয়বছর কোটি কোটি টাকা লাভ করে কয়েক মাস লোকসান হচ্ছে এটা সামাল দেয়া গেল না। এটা হয় না।’

ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ভাড়া বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক। কারণ বলা হয়েছে সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া বাড়বে না। এখন কোনটা সিএনজি আর কোনটা ডিজেলে চলে কে দেখবে। নানা অজুহাত দিয়ে সবাই ডিজেলচালিত বলে যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নেবে। জনগণের পকেট কাটা যাবে। সড়কে বিশৃঙ্খলতাও বাড়বে।’

ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার থেকে বাস চালানো বন্ধ করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। আর ডিজেলের দাম কমানোর দাবিতে ধর্মঘট পালন করছে পণ্যবাহী বাহন। শনিবার থেকে ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে লঞ্চও বন্ধ রেখেছে মালিকরা।

এমন অবস্থার মধ্যে রবিবার বিকালে বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিআরটিএ। বৈঠক শেষে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসের ভাড়া গড়ে ২৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করে বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণী কমিটি।

একইভাবে মহানগর এলাকার বাসভাড়া ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা থেকে ৮ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা বৈঠকে।

প্রজ্ঞাপন জারির পর সোমবার থেকে নতুন এই ভাড়া কার‌্যকর হবে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ। অন্যদিকে লঞ্চ মালিকরাও কিলোমিটার প্রতি প্রায় দিগুন ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করলেও এ বিষয়ে বিআডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। আর দাবি না মানা পর‌্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ট্রাক মালিকরা।

ডিজেলে চলে কত বাস?
তথ্য মতে, ঢাকায় বিআরটিএর অনুমোদিত বাস রয়েছে ১২ হাজার ৫২৬টি। আর বুয়েটের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এসব বাসের ৯৫ শতাংশই চলে গ্যাসে। সেই হিসাবে ঢাকায় মাত্র ৬২৬টি বাস ডিজেলে চলাচল করে। বাকি ১১ হাজার ৯০০ বাস গ্যাসে চলে।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে দূরপাল্লায় চলাচল করে ১৬ হাজার বাস। এদের মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হাজার ২০০ বাস। আর ডিজেলে চলে ৪হাজার ৮০০ বাস। অন্যদিকে সারাদেশে চলাচল করা ৭৮ হাজার বাসের মধ্যে গ্যাসে চলে ৪৬ হাজার ৮০০ বাস। আর ডিজেলে চলে ৩১ হাজার ২০০ বাস।

এদিকে পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির সূত্র বলছে, বর্তমানে পণ্য পরিবহন খাতে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭৩টি নিবন্ধিত গাড়ি আছে। এদের প্রায় সবই ডিজেলচালিত।

গ্যাসে চালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছেন পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তারাও সব বাসের ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করছেন।

অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এখন বাস চালকরা অজুহাত দেবে লাইনে গ্যাস ছিল না। গ্যাস নেওয়ার সময় হয়নি। কেউ হয়তো বলবে তার গাড়ি সিএনজির পাশাপাশি ডিজেলেও চলে। এখন এসব দেখবে কে?’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘গ্যাসের দাম যখন বাড়ে তখনো ঢাকায় বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। এখন যখন ডিজেলের দাম বেড়েছে তখনো ঢাকায় বাসের ভাড়া বাড়ানো হবে। এটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।’

নতুন ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘ভাড়া বৃদ্ধি বা ডিজেলের দাম কমানোর এই মারপ্যাঁচে ভুগছে সাধারণ মানুষ। কারণ ঢাকায় চলা ৯৫ শতাংশ বাসে ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এগুলো সব গ্যাসে চলে। যেসব বাস ডিজেলে চলে সেগুলো সরকারকে চিহ্নিত করতে হবে।’

শেয়ার করুন