২২ অক্টোবর ২০২১
অতিথি প্রতিবেদক : শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না আসলে খোঁজ খবর নেন শিক্ষকরা। অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, স্কুল ছুটিরপর শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরেছেন কি-না খবর নেন, আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যার মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সাহস দেন। শিক্ষকদের আন্তরিকতায় নিতান্ত হতদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা উদ্ভাসিত হচ্ছে শিক্ষার আলোয়।
২০০৮ সাল থেকেই এভাবে শিশুদের উন্নত পরিবেশে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া নগরীর ঘাসিটুলা ইউসেপ স্কুল এখন অর্থ সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে। সিলেটের বিত্তবানরা এগিয়ে না আসলে স্কুলটি আগামী জানুয়ারী থেকে সাধারণ শিক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে বলে জানিয়েছেন ইউসেপ বাংলাদেশের সিলেট রিজিওনের রিজিওনাল ম্যানেজার মো. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি জানান, ইউসেপ তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পুনর্গঠন করছে। বিদেশী দাতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউসেপ তাদের সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রমকে কারিগরি শিক্ষায় নিয়ে যাচ্ছে। তাই ঘাসিটুলা স্কুলটির সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম চালানো ইউসেপ এর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
জানা যায়, ইউসেপ বাংলাদেশ সিলেট নগরীর অবহেলিত ঘাসিটুলা ও বালুচর এলাকায় নিম্ন আয়ের পেশাজীবী ছেলে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে দু’টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এসব স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থী দিনমজুর, রিক্সাচালক, ঠেলা চালক, সবজি বিক্রেতা, দোকান কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। ইউসেপ তাদের দায়িত্ব নিয়ে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের শিক্ষা দেয়। এই দুই স্কুল থেকে পাশ করে অনেক শিক্ষার্থী এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অনেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে উচ্চ বেতনে চাকুরীসহ উন্নত জীবনযাপন করছেন। ঘাসিটুলা শাখায় বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ৫২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই স্কুলে পড়ালেখা করা দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েদের বিশেষ যত্ন নিতে হয়। ইউসেপের শিক্ষকরা সর্বক্ষণ তাদের ও তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখেন। একদিন স্কুলে না এলেই শিক্ষকরা তাদের পরিবারের নিকট খোঁজ নেন। স্কুল ছুটির পর মেয়েরা বাসায় ফিরছে কি-না শিক্ষকরা জানতে চান। পারিবারিক দৈন্যদশার কারণে এসব শিশু একদিনও যদি স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; তখনই তারা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে বলে জানান তারা। তাই এসব শিশু যাতে কোন ভাবেই স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় ; সেজন্য শিক্ষকরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। এমনকি তাদের পরিবারের পিতা মাতার সাথেও সমানভাবে যোগাযোগ রাখেন।
শিক্ষক শাহ আলম জানান, স্কুলের প্রায় সব ছাত্রই রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা অথবা দিনমজুরের সন্তান। হতদরিদ্র এসব পরিবারের সন্তানকে পিতামাতা কাজে দিয়ে দিতে চায়। পিতামাতাকে বুঝিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করানো হয়। কোন কারণে একদিনও স্কুলে না এলে পিতামাতার সাথে যোগাযোগ করা হয়, যাতে ছেলে মেয়েদের তারা অন্য কাজে দিতে না পারেন। এখন স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে এসব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন চরম হুমকিতে পড়বে। অন্য কোথাও টাকা দিয়ে এসব পরিবার তাদের সন্তানদের পড়ালেখা করাতে পারবে না। এখন অন্তত: যারা ভর্তি হয়েছে তাদের লেখাপড়া শেষ করার জন্য সিলেটের বিশিষ্টজন বিত্তশালীরা এগিয়ে এলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে বালুচর স্কুলটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ‘কি-ক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করায় সেখানে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে। ঘাসিটুলা স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্ব কেউ নিলে ৫২০টি শিশু এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবে।
ঘাসিটুলা স্কুলের ৭ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ভ্যান চালক কামাল আহমদ জানান, এখানে খুব সামান্য বেতন দিতে হয়। অনেক সময় কয়েক মাসের বেতন না দিতে পারলেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কিছুই বলেন না। স্কুলটি থাকায় তার মেয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে এবং এক ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। যদি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তার পক্ষে ছেলে মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তিনি জানান, এখানকার শিক্ষকরা পাঠদানে খুবই আন্তরিক। তারা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পিতামাতার সাথে যোগাযোগ রাখেন। যতই কষ্ট হোক ছেলে মেয়েদের, অন্তত: এসএসসি পর্যন্ত পড়াতে উৎসাহ যোগান, সাহস দেন। অনেকেই অভাবের কারণে ছেলে মেয়েদের কাজে দিয়ে দিতে চান ; কিন্তু শিক্ষকদের অনুরোধে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। স্কুলে সাধারণ শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। অভিভাবকরা এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
‘পিতা রাজমিন্ত্রী। তাঁর একার আয়ে পরিবার চলে না। অনেক কষ্টে তিনি একাই ৫ সদস্যের পরিবার চালিয়ে নিচ্ছেন। এখন স্কুল বন্ধ হলে অন্যত্র পড়ালেখা করা সম্ভব নয় এবং নিশ্চিত ভাবে লেখাপড়া ছেড়ে কাজে নামতে হবে’ জানায় দশম শ্রেণির ছাত্র দেলোয়ার হোসেন। তাদের স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থীর অবস্থা প্রায় একই বলে জানায় সে।
ইউসেপ বাংলাদেশের সিলেট রিজিওনের রিজিওনাল ম্যানেজার মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ইউসেপ সম্পূর্ণভাবে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশী দাতাদের সহায়তায় পরিচালিত হয়। বিদেশীরা এখন সাধারণ শিক্ষায় টাকা দিচ্ছে না। ইউসেপের যেহেতু কোন আয় নেই, তাই সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ইউসেপের জন্য এখন সম্ভব হচ্ছে না। ইউসেপ তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পুনর্গঠিত করে কারিগরি শিক্ষায় নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ইউসেপের কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। গত এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় সিলেটের বটেশ্বরস্থ ইউসেপ-হাফিজ মজুমদার টেকনিক্যাল স্কুল দেশের মধ্যে সেরা হয়েছে। এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় সিলেটের বিত্তবান মানবিক ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি আছে তারা অন্তত: এখান থেকে তাদের এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষা শেষ করতে পারবে। অন্যথায় আগামী জানুয়ারি থেকেই তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি এ ব্যাপারে সিলেটের সুশীল সমাজ ও বিত্তবানদের সুদৃষ্টি কামনা করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইউসেপ এর এমপ্লয়ার্স কমিটির সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।