১১ অক্টোবর ২০২১
নিজস্ব প্রতিবেদক : নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের ফলে নিহত রায়হান আহমেদ হত্যাকাণ্ডের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েবের সাথে জড়িত এবং বহিস্কৃত এসআই আকবরের সহযোগী স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমানকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ মামলার প্রধান আসামী আকবর সহ বাকি ৫ আসামীকে গ্রেফতার করলেও নোমানের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানের উপর নির্যাতনের স্বাক্ষী সিসি ক্যামেরার ফুটেজ গায়েব করার সাথে নোমানের নাম উঠে আসার পর থেকেই আলোচনায় আসে তিনি। এবং একই সাথে প্রশ্ন জাগে নিহত রায়হান সম্পর্কিত সংবাদের “ছিনতাইকালে গনপিটুনীতে যুবক নিহত” শিরোনামে নিউজ প্রকাশের।
সিলেট নগরীর একটি কম্পিউটার দোকান থেকে নতুন হার্ডডিস্ক কিনে ফুটেজ ধারণকৃত পুরনো হার্ডডিস্কটি মূল অভিযুক্ত এসআই আকবর, সদ্য বরখাস্ত এসআই হাসান ও নোমান মিলে গায়েব করেন। লাপাত্তা হয়ে যায় নির্যাতনের প্রমাণ ধারণ করা মূল হার্ডডিস্ক। অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল নোমান সিলেটের একটি জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলো। সে উপজেলার বুরিডহর গ্রামের মো. ইছরাইল আলীর ছেলে। তার বাবা কোম্পানীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক। আর মা মোছা. বিলকিস আক্তার উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, কোম্পানীগঞ্জের স্বাস্থ্য কর্মী।
কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী বরমসিদ্ধিপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন- ঘটনার দিন গত ১১ই অক্টোবর রাতে তারা সাংবাদিক নোমানের সঙ্গে আকবরকে সেখানে দেখেছেন। তারা মোটরসাইকেলে হেলমেট পরে বরমসিদ্ধিপুর গ্রামের হেলালের বাড়িতে যান। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেন। এরপর নোমানকে সঙ্গে নিয়ে আকবর ভারত সীমান্তে ঢুকে পড়েন। আর এতে সহায়তা করেছে বরমসিদ্ধিপুরের হেলাল। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে হেলালের সঙ্গে সীমান্তের ওপারের খাসিয়াদের ভালো সম্পর্ক। এছাড়া হেলাল এক খাসিয়া নারীকে বিয়ে করেছেন বলে এলাকার মানুষ জানেন। এ কারণে হেলালও সব সময় ভারতের খাসিয়া এলাকায় অবাধে যাতায়াত করে। হেলালের মাধ্যমে ভোরের আগে ভারতে প্রবেশের সময় আকবরের সঙ্গে সাংবাদিক নোমানও ছিলেন। এরপর নোমান আকবরের কাছ থেকে অনত্র চলে যান৷ পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কৌশলে আকবরকে দেশে ফিরিয়ে এনে ধরলেও নোমানের পাত্তা পাওয়া যায়নি।
কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন- আকবরের সঙ্গে নোমানের সম্পর্ক পারিবারিক। এ কারণে নোমান সিলেটে বসবাস করতেন এবং আকবরকেই সঙ্গ দিতেন। রায়হান খুনের আগে নোমান কোম্পানীগঞ্জে ছিল। সেখান থেকে ঘটনার দিন সকালে সে সিলেটে যায়।
সিলেটে পৌঁছে তিনি আকবরের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। তারা জানান- নোমানের সঙ্গে গত ১২ই অক্টোবর তারা যোগাযোগ করতে পারেননি। ওইদিন নোমান তার ফেসবুক আইডিও ডিএ্যাক্টিভ করে ফেলেন। ফলে নোমান কোথায় আছে সেটি তারাও জানেন না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও কোনো উত্তর দিতে পারেনি। এরই মধ্যে নোমানের পিতা ইসরাইল আলীকেও কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আইনশৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনী।
ঘটনার মাসখানেক আগেও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে তার নাম আলোচনায় থাকলেও এখন চাঞ্চল্যকর রায়হান হত্যাকাণ্ডের ধারণকৃত নির্যাতনের ফুটেজ গায়েব করে তিনি নিজেও এখন লাপাত্তা। ইতোমধ্যে নোমানের অবস্থান জানতে শুরু হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। নোমানকে গ্রেপ্তারের জন্য এখনো তৎপর রয়েছে পিবিআই, সিলেট জেলা পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা।
তবে একটি অসমর্থিত সুত্রে জানা গেছে, নোমান এখন ফ্রান্সের প্যারিস শহরের একটি গ্রামে অবস্থান করছে। নোমান এর আগে ভারত থেকে একটি দেশে যায়। সেখান থেকে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে প্রবেশ করে। তবে নোমান কোথায় রয়েছে এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দোটানার মধ্যে রয়েছে।
এসএমপি কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ জানান, আলোচিত মামলার তদন্ত করেছে পিবিআই। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন আছে। নোমান কোথায় আছে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ বলছে রাশিয়া, কেউ বলছে ফ্রান্স, কেউবা বলছে এখনো ভারতেই আছে। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এনসিবি ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে নোমানকে গ্রেপ্তারে কাজ শুরু করতে পারবে।
তিনি আরও জানান, আদালত থেকে পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। এর ভিত্তিতে আদালত তার সমস্ত সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশ প্রদান করবেন। পাশাপাশি আসামির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলোচিত এ মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত এক হাজার ৯০০ পৃষ্ঠাার তদন্ত প্রতিবেদনা চার্জশিট গ্রহণ করেন এবং এ সময় মামলার পলাতক আসামি আব্দুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।