১১ সেপ্টেম্বর ২০২১
ডেস্ক রিপোর্ট : করোনার সংক্রমণের ভয়ে দেড় বছরের প্রায় পুরোটাই ঘরবন্দী অবস্থায় কাটায় সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মাহিয়া মারজানা। সম্প্রতি এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে কলেজে গিয়ে আবেগে কান্না চলে এসেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এতটা সময় আমাদের বয়সীরা কিভাবে ঘরে বসে কাটিয়ে দিতে পারে? কি কষ্ট হয়েছে তা আমরাই জানি। টেলিভিশন দেখে আর মোবাইল দেখেও কাটানো যায় কত সময়? উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির পর মাত্র কয়েকদিন ক্লাস করেছি। কলেজ জীবনের কোনো স্বাদই পাইনি। অবশেষে কলেজ খুলছে।
ধন্যবাদ সরকারকে। আবারও স্কুলে যেতে পারবে এই আনন্দে উচ্ছ্বসিত একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ছাত্রী মালিহা মারজানা। আনন্দমাখা কণ্ঠে বলেন, ঘরবন্দী অবস্থায় যে দিন কাটায় সেই জানে কি কষ্ট। আবারও বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা হবে, প্রিয় শিক্ষকদের ক্লাস করতে পারব। কি যে আনন্দ হচ্ছে। শুধু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এই দু’বোনই নয়, প্রিয় ক্যম্পাসে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সিলেটের প্রায় সব এলাকার সব শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শঙ্কায় দিনের পর দিন ঘরবন্দী থেকে তাদের পার করতে হয়েছে একঘেয়েমি জীবন। এই সময়টাতে নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণের মাটির ঘ্রাণ পায়নি কোন শিক্ষার্থী।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণার খবরে উচ্ছ্বসিত তারা। সেই সঙ্গে স্কুল-কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছে ঘরে ঘরে। নতুন স্কুলব্যাগ, জুতা ও ড্রেস কিনতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মার্কেট যাওয়া শুরু হয়েছে অভিভাবকদের। ভিড় বেড়েছে স্কুলব্যাগ, স্কুল ড্রেস তৈরির দর্জির দোকানগুলোতেও। নগরীর হাসান মার্কেটে শিশু সন্তানের জন্য স্কুলব্যাগ কিনতে আসা গৃহীনি নাফিসা হুমায়ুন বলেন, করোনায় আমাদের খুব কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।আমাদের জীবনের অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে।দীর্ঘদিন পর স্কুল খুলছে।ছেলে আলবাব স্কুল ব্যাগের জন্য বায়না ধরেছে। তাই তার ব্যাগ কিরতে মার্কেটে আসা। নগরীর মিতালী ম্যানশনে মেয়ের স্কুলের নতুন ড্রেস বানাতে এসেছেন রহিমা বেগম। তিনি বলেন, আমার মেয়ে স্কুলে ৩য় শ্রেণী থেকে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে।
এর মধ্যে স্কুলে আর যেতে হয়নি। তাই স্কুল ড্রেসও পরা হয়নি। দীর্ঘদিন আলমারি বন্দী থেকে থেকে ড্রেসগুলো কেমন যেন হয়ে গেছে। তাই নতুন ড্রেস বানাতে এসেছি।
দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার খবরে প্রতিটি শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারে এভাবেই চলছে প্রস্তুতি। প্রিয় ক্যম্পাসে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে শিক্ষার্থীরা। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের উপযোগি করতে চলছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজও।এ প্রস্তুতি চলছে নগরীসহ জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল হাকিম বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন চলছে। সোমবার তিনি সুনামগঞ্জের এসসি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় পরিদর্শনে ছিলেন।
যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমস্যা ছিল, সংস্কারের প্রয়োজন সেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়ে গেছে। এখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের উপযোগী।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি লতিফুর রহমান রাজু জানান, প্রায় ১৯ মাস পর অবশেষে খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণায় প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে সুনামগঞ্জের সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আবারো শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে বিদ্যাপীঠের আঙিনা, এমনটা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পাঠদান, পরীক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণায় শিক্ষাঙ্গনে ফিরে আসবে প্রাণের স্পন্দন।
১২ সেপ্টেম্বর রোববার থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এজন্য বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চ সাজাতে হবে ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে, ৫ ফুটের কম দৈর্ঘ্যরে বেঞ্চে একজন শিক্ষার্থী এবং ৫ ফুটের বেশি দৈর্ঘ্যরে বেঞ্চে দুজন শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস করতে পারবে। স্কুলে ঢোকার আগেই তাপমাত্রা পরীক্ষা করা ও সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, বিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তারাও মানসিকভাবে ভালো নেই। অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চললেও সবার সঙ্গে দেখা হয় না। তাই বিদ্যালয় খোলার ঘোষণায় আনন্দিত তারা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আসবে, নতুন করে সাজবে, শিখন ও শেখানোর মধ্য দিয়ে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরবে প্রিয় প্রতিষ্ঠানে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৩৩টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৪৭৫টি। সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিদ্যালয় আঙিনা পরিষ্কার করা, বসার আসন জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, মাস্ক ও শরীরে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র কেনা সম্পন্ন করেছেন তারা।
সুনামগঞ্জ সরকারি জুবীলি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফয়েজুর রহমান বলেন, চার-পাঁচ মাস আগে আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ করতে বলা হয়েছিল। তখন থেকেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। শ্রমিক দিয়ে বিদ্যালয় আঙিনা পরিষ্কার, জীবাণুনাশক দিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে রেখেছি। মাস্ক, তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রও কিনে রেখেছি। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার জায়গা নির্ধারণ করেও রেখেছি।
তিনি আরো বলেন, এত দিন যে রকম জীবনযাপন করেছি সেটা আর ভালো লাগছে না। কতদিন হলো শিক্ষার্থীদের মুখ দেখি না। বিদ্যালয় খুলছে শোনার পরে আমরা খুবই খুশি হয়েছি। আশা করি আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান আবারো শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম আবদুর রহমান বলেন, আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। বিদ্যালয় খোলার পরেও যেন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানেন সে বিষয় দেখভাল করার জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলে দেয়া হয়েছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া ছিল। এখন আবারো নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১২ তারিখ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরবেন।মৌলভীবাজার থেকে স্টাফ রিপোর্টার এমএ হামিদ জানান, দীর্ঘদিন পর আগামী ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল খুলছে। এমন খবরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ। এ আনন্দের ঢেউ লেগেছে পিছিয়ে পড়া চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যেও। স্কুল খোলার খবর শুনে সোমবারই মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার মাথিউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয় স্কুলটির শিক্ষার্থীরা। তাদের উদ্দেশ্য স্কুল খোলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া।
প্রধান শিক্ষক স্কুল খোলার বিষয়টি নিশ্চিত করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ আর আনন্দের ঢেউ দেখা যায়। বাড়িতে এসে মা-বাবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে তারা বলে ওঠে আহা! কী আনন্দ! স্কুল খুলবে। আনন্দে তারা পাড়া-মহল্লা মাতিয়ে তোলে। সোমবার এমন দৃশ্যই দেখা গেছে মাথিউরা চা বাগানের বাড়িগুলোতে। ওই স্কুলটিতে ২৭৩ জন ছাত্রছাত্রী ও চারজন শিক্ষক রয়েছেন। কথা হয় স্কুুলের শিক্ষার্থী শিউলি, বৃষ্টি, সাবিত্রী, আকাশ ও বিশ্বজিতের সঙ্গে। তারা বলে, অনেকদিন পর স্কুলের তালা খুলবে জেনে মনে আনন্দ লাগছে। এতো দিন পর আমরা আবার পড়ার টেবিলে বসবো। স্কুলে যাবো, বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। কী আনন্দ, কী মজা!
৯ নম্বর শ্রমিক লাইনের বাসিন্দা অভিভাবক রামজিৎ রবিদাস বলেন, স্কুল খুলবে এমন খবর শুনে খুব আনন্দ লাগছে। স্কুল বন্ধ থাকায় বাচ্চারা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করতো না। শিশুরা উচ্ছৃঙ্খল জীবনের দিকে যাচ্ছিল। এখন তাদের মাঝে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
অভিভাবক পার্বতী রবিদাস বলেন, স্কুল খুলবে শুনে খুব আনন্দ লাগছে। ছেলেমেয়েরা আবার পড়ার টেবিলে বসবে। স্কুল বন্ধ থাকায় বাচ্চারা খেলাধুলা করে দিন কাটাতো। স্কুলে গেলে নিয়মিত খাওয়াদাওয়া করবে। জীবনটা রুটিন কাজের মধ্যে ফিরে আসবে। এতে আমরা অভিভাবকরা শান্তি পাবো।
মাথিউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অর্জুন গৌড় বলেন, আমাদের বিদ্যালয়টি চা বাগানে অবস্থিত। এখানে চা শ্রমিকদের সন্তানেরা পড়ালেখা করে। আমার বিদ্যালয়ে ২৭৩ জন ছাত্রছাত্রী ও ৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার্থীরা খুবই আন্তরিক, খবর পেলে দৌড়ে স্কুলে আসে। স্কুলে আসার আগ্রহ তাদের অনেক বেশি। ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল খোলার খবর শোনার পর থেকে প্রতিদিনই খবর নিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্কুল খোলার খবর শুনে আনন্দে আটখানা হয়ে আছে।
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, স্কুল খোলার প্রস্তুতি হিসাবে হবিগঞ্জের বিদ্যালয়গুলোয় চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। মাঠের আগাছা পরিষ্কার ও ক্লাসগুলোকেও করা হচ্ছে পাঠ উপযোগী।
হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ আলফাজ উদ্দিন জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে স্কুলের কিছু আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে, ধুলো-বালি জমেছে বেঞ্চে-ডেস্কে। বৈদ্যুতিক পাখাগুলোয় মাকড়সা বাসা বেঁধেছে। এগুলো পরিষ্কার ও মেরামত করা হচ্ছে।
১২ সেপ্টেম্বর রোববার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আগের ঘোষণা অনুযায়ী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানান তিনি।
এছাড়া, বর্তমানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ‘রিওপেনিং’ (পুনরায় ক্লাস চালু করা) পরিকল্পনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ ছাড়া করোনাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও এ নিয়ে বেশকিছু সুপারিশ দিয়েছে।করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক বার চেষ্টা করেও এই মহামারীর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর খোলা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দ্রুত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়। এরপর ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ পর্যন্ত গত ১৭ মাসে দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি বাড়ানো হয়েছে। করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় সবশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান সাধারণ ছুটি ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়।