৪ জুন ২০২১


চা-বাগানের বৃত্তেই বন্দি জীবন

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : চা-বাগানের বৃত্তেই বন্দি তাঁদের জীবন। কোথাও আশার আলো নেই, নেই উন্নত জীবনের স্বপ্নও। কারণ তাঁরা চা-শ্রমিক। তাই তাদের সন্তানরাও পেরোতে পারছেন না বাগানের গণ্ডি। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ পেশায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়া এসব মানুষের ভাগ্যও বদলাচ্ছে না। চাহিদা আর উচ্চ মূল্যের কারণে চা পাতার ব্যবসা লাভজনক হলেও মালিকদের নানা অজুহাতে বাড়ছে না চা শ্রমিকদের মজুরি। এ কারণে যুগ যুগ ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন চা-শ্রমিকরা। এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে আজ দেশে প্রথমবারের মতো পালিত হবে চা দিবস।

১৮৫৪ সালে পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের সিলেটেই প্রথম চা উৎপাদন শুরু হয়েছিল। মালনীছড়া চা বাগানের মধ্যে দিয়ে চা চাষ শুরু হলেও এখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশে চায়ের রাজ্য বেড়েছে।

চা বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৬টি চা বাগান আছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে ৯১টি, হবিগঞ্জে ২৫টি ও সিলেট জেলায় আছে ১৯টি চা বাগান। বাকিগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় জেলায়।

বর্তমানে এসব বাগানের চা শ্রমিকরা দৈনিক সর্বোচ্চ ১২০ টাকা মজুরি পান। এই স্বল্প মজুরিতে চা শ্রমিকরা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন। তাছাড়া যুগ যুগ ধরে তাঁরা এই বঞ্চনার শিকার। শুধু এই মজুরির বঞ্চনাই নয়, তাঁদের বাসস্থানও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। গত আগস্টে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বানে দেশব্যাপী চা শ্রমিকরা একযোগে মজুরিসহ নানা দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে একপর্যায়ে সরকার উদ্যোগ নিয়ে তাঁদের মজুরি ১৮ টাকা বৃদ্ধি করে। আগে এই মজুরি ছিল ১০২ টাকা।

দেশের বিভিন্ন বাগানের চা-শ্রমিকরা মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি জানাচ্ছেন প্রতি বছরই। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে চা বাগান আগলে রাখলেও তাদের শিক্ষা ও চিকিৎসা এখন সেই অবহেলিত রয়ে গেছে।

এদিকে বর্তমান যুগেও চা-শ্রমিকরা লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের একটা কুঁড়ে ঘরে থাকতে হচ্ছে। কয়েকটি চা বাগানে শ্রমিকদের বাসস্থানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তাঁরা। চুক্তি কিংবা খাতাপত্রে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্যের প্রথম শর্ত হিসেবে একটি পরিকল্পিত বাসস্থান নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো নজির পাওয়া যায় না। ছন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারকে। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরে বসে থেকেও তাঁদের ভিজতে হয়।

এর আগে সরকার তাদের আবাস্থল নিজ নিজ মালিকানায় করে দিবে বলেও এখনো এর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। আর এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন চা শ্রমিকরা।

চা শ্রমিকরা জানান, বাগানের হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে। বাগানে যে কয়েকটা ছোট হাসপাতাল রয়েছে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ ও ডাক্তার না থাকায় রোগমুক্তি হচ্ছে না। অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। তাছাড়া বাগানের কিছু কিছু ছেলে-মেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও চাকরির ক্ষেত্রে বড় কোনো পদ পাচ্ছে না।

এদিকে- দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ হিসেবে পরিচিত সিলেটে ১৮৫৪ সালে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চা চাষ শুরু হয়। এরপর সময়ে সময়ে বেড়েছে চা বাগানের সংখ্যা। বেড়েছে এই খাতে শ্রমিকের সংখ্যাও। তবে চা বাগান অঞ্চলে কাজ করা বেশিরভাগ শ্রমিকরাই অতিদরিদ্র। সচেতনা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

বেসরকারি সংস্থা দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল ও হিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, চা-বাগান অঞ্চলে প্রতি ১০ হাজারে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা ২০ জনের অধিক। তবে ২০২১ সালে করোনাভাইরাসের কারণে কুষ্ঠ রোগী শনাক্তকরণে বিলম্ব হয়। হয় বাধাগ্রস্তও। তারপরেও চলতি সিলেট জেলায় ২৪ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে মোট জীবানুযুক্ত রোগীর সংখ্যা ২ জন এবং কম জীবাণুমুক্ত রোগীর সংখ্যা ২২ জন। এর মধ্যে বেশি জীবানুযুক্ত শিশু রোগী ২ জন ও কম জীবাণুমুক্ত শিশু রোগী ২ জন রয়েছে। এছাড়া আরো ৭ জন সন্দেহজনক কুষ্ঠ রোগী রেজিস্ট্রেশনের অপেক্ষায় আছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, বর্তমানে চা শ্রমিকরা যে মজুরি পাচ্ছে তার মিল নেই বাজার মূল্যের সঙ্গে। বাগানের চায়ের উৎপাদন বেড়েছে। বাজারে চায়ের দামও বেশি। কিন্তু চা বাগান মালিকপক্ষ নানা অজুহাতে সঠিক মজুরি দিতে রাজি হন না।

তিনি আরও জানান, চা বাগানের মালিকরা লাভবান হলেও খরচের বিভিন্ন দিক দেখিয়ে চায়ের মূল্য পাচ্ছেন না বলে অজুহাত দাঁড় করেন। তারপর বর্তমান সরকারের আমলে চা শ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বাড়ানো হয়।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালীর সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, চা-শ্রমিকরা যুগযুগ ধরে বঞ্চনার শিকার। তারা সারাদিন কাজ করলে যে মজুরি পান তা দিয়ে একজন মানুষও খেয়ে বাঁচতে পারবে না। এরপর চিকিৎসা, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদাও মিলছে না বাগানে। এসব সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো চা দিবস পালন করা হচ্ছে। আমরা আশা করবো সবাই মিলে চা-শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্ঠা করবেন। কারণ এই শিল্পের সাথে অনেক মানুষ জড়িয়ে আছেন।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালের ৪ জুলাই প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হিসেবে চা বোর্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। গ‌ত বছরের ২০ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে জাতীয় চা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

শেয়ার করুন