২৯ মে ২০২১


ভুমিকম্পের ডেঞ্জার জোন সিলেট

শেয়ার করুন

দিনা রহমান : ভুমিকম্পের ডেঞ্জার জোন সিলেট। বাংলাদেশ ও ভারতের অন্যান্য এলাকা থেকে সিলেটের ভুপ্রাকৃতিক অবস্থা ও ব্যবস্থা ভিন্ন। সামপ্রতিক সময়ে নেপাল ও ভারতের মনিপুরের মত মাঝারি ধরনের ভুমিকম্পের উৎপত্তি সিলেট হলে ঘটে যাবে মহা প্রলয়। ধবংসস্তুপে পরিনত হবে হাজার হাজার ভবন ও বাড়ি। ক্ষয়-ক্ষতি হবে সীমাহীন । প্রাণহানী ঘটবে অসংখ্য বনি আদমের। যদিও নেপালে সংঘটিত ৮.৫ মাত্রার ভুমিকম্প ও ভারতের মনিপুরে সংঘটিত ৬.৯ মাত্রার ভুমিকম্পে সিলেটে তেমন ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি।

সবশেষ শনিবার সিলেটে কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে পঞ্চমবারের মতো ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সকাল ১০ টা ৩৭ মিনিটের সময় প্রথমে ভূমিকম্প অনুভব হয়। এ কম্পনের রেশ কাটতে না কাটতে ফের ১০ টা ৫১ মিনিটে সামান্য ভূকম্পন অনুভত হয়। তবে দ্বিতীয় দফায় ভূমিকম্প হলেও প্রথম কম্পনের সময় মানুষের মাঝে বেশি আতংক দেখা দেয়। এরপর ১১টা ৩০ মিনিট ও ১১টা ৩৪ মিনিটে কেঁপে ওঠে সিলেট। সবশেষ ১ টা ৪৭ মিনিটের দিকে ভূকম্পন অনুভূত হয়। তবে আবহাওয়া অফিস হিসেবে নিয়েছে চারবারের ভূমিকম্প। এরমধ্যে ১০ টা ৫১ মিনিটের ভূকম্পন এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ১।

এদিকে ভূকম্পন চলাকালীন সময় নগরীর বাসা-বাড়ির বাসিন্দারা অনেকটা আতংকিত হয়ে নিরাপদ স্থানে নেমে আসেন। এদিকে পর পর ভূমিকম্প অনুভব হলেও তাৎক্ষনিক কোন ক্ষয় ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভূমিকম্পে আতংক বিরাজ করছে জনসাধারণের মনে।
ঢাকা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের সার্ভারের হিসেবে চারবার ভূমিকম্প ধরা পড়েছে। আর এটি একদম সিলেট শহরেই এর উৎপত্তি। এজন্য সিলেটের মানুষ একটি বেশি ভূকম্পন অনুভব করছেন।

সিলেট ভুমিকম্পের ডেঞ্জার জোন এর মধ্যে এ ভুমিকম্পের উৎপত্তি স্থলই ছিল সিলেট শহরে। যে কারনে বেশী আতংক দেখা দিয়েছে। আতংকের মুল কারন হলো সিলেটের ও সিলেট মহানগরীর আবাসন ও বানিজ্যিক ভবনগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্টান ও অফিস আদালতের সামপ্রতিক নির্মিত ভবনগুলো খুবই ঝুকিপূর্ন।
বাংলাদেশের ভুমিকম্প কয়েকটি ফলটে বিভক্ত। এর ডেঞ্জার জোন বা ফল্ট হচ্ছে ডাউকি।

সিলেট নগরী থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে তামাবিল সীমান্ত চৌকির ওপার হচ্ছে ডাউকি চেকপোস্ট। ভারতের মেঘালয়া রাজ্যের মাঝামাঝি অংশের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের দক্ষি পাদদেশ বাংলাদেশের সীমান্তঘেষা এলাকার নাম ডাউকি। ডাউকি নামের থানা ও বাজারটি ভারতের অভ্যন্তরে পড়লেও এ ভুমিকম্প ফল্টের সিংহভাগ এলাকা তামাবিল বা অন্য নামে বাংলাদেশেরই অংশ। সুতরাং ডাউকি ফলটে নাড়া দিলেই ভারতের চেয়ে বড় ঝাকুনিতে পড়বে বাংলাদেশের সিলেট।

১৮৯৭ সালে ওই ডাউকি ফলটে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভুমিকম্প হলে সারা সিলেট ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছিল। ধুলিস্যাত হয়ে পড়েছিল সিলেট নগরীর তৎকালীন পাকা আধাপাকা সব স্থাপনা। একমাত্র কালীঘাটের নবাবী মসজিদ ছাড়া আর কোন স্থাপনা টিকে থাকেনি। সুরমা কুশিয়ারাসহ সব নদ নদীর পরিবর্তন ঘটে। সিলেট বিভাগ জুড়ে সৃষ্টি হয় বৃহদাকারের হাওর ও বিলের। সিলেট নগরীর কয়েকটি বড় বড় দিঘী-নালাও সেই সময়ের ভূমিকম্পেরই সৃষ্টি। সে সমযে টিনসেড ও চুরনচুরকির একতলা দালানঘর ছিল সিলেট নগরীতে। তা সত্বেও সিলেট নগরী ধুলিস্যাত হয়ে গিয়েছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভুমিকম্পে। তৎসময়েও প্রাণহানী ঘটেছিল প্রায় ১০ হাজার বনি আদমের।

আমাদের পূর্বসূরীরা জানিয়েছেন সেই ভুমিকম্পের আফটার শক ৭দিন পর্যন্ত চলতে থাকে।
এই একবিংশ শতাব্দিতে সিলেটেতো আর সেই চুনচুরকি ও টিনসেড দালান নেই। সিলেটে গড়ে উঠেছে দ্বিতল থেকে শুরু করে ১৫ ও ২০তলা আবাসিক ও বানিজ্যিক ভবন। বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার একাডেমিক ভবনগুলোও ৪ থেকে ৫ তলার কম নয়। এ অবস্থায় যদি ডাউকি ফল্টে ভুমিকম্পের উৎপত্তি হয় তা হলে ঘটে যাবে মহাপ্রলয় ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডাউকি ফল্টে রিখটার স্কেলে ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূকম্প হলেই সিলেটের পরিণতি হবে ভয়াবহ। আর ভূমিকম্পের মাত্রা যদি হয় ৮ হয়, তবে জনশূন্য বিরাণ ভূমিতে পরিণত হবে সিলেট। রিখটার স্কেলের ৮ মাত্রার ভূকম্পের কয়েক সেকেন্ডে গোটা সিলেটে হাজার হাজার ভবন মাটির সাথে মিশে যাবে। প্রাণহানি ঘটবে লাখ লাখ মানুষের। ক্ষতি হবে হাজার হাজার কোটি টাকার। এমনি এক ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, ডাউকি ফল্টে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে সিলেট।

বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, সিলেট অঞ্চল যে টেকনোটিক প্লেটে রয়েছে, তা ক্রমেই উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। এক শতাব্দিতে তা এক মিটার করে সরছে। এ কারণে এ অঞ্চল প্রবল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে ৩টি ভূকম্প বলয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তথা প্রথম বলয়েই রয়েছে সিলেট। এ বলয়ে ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূকম্পন হতে পারে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় প্রতি ১শ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটতে পারে। সিলেটে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়ংকর ভূমিকম্পের পর পেরিয়ে গেছে ১শ ১৯ বছর । যে কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের আরেকটি ভূমিকম্পের আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিকভাবে ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব ৩০-৪০ সেকেন্ড হয়ে থাকে। কিন্তু গত ২৫ এপ্রিল, শনিবার যে ভূকম্পন হয়েছে, সেটা বিস্ময়করভাবে ৯০ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। এটা অবশ্যই বিপদসংকেত। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ডাউকি থেকে মাত্রা অর্ধশত’ কিলোমিটার দূরে রয়েছে সিলেট নগরী। ডাউকি পয়েন্টে যদি ৬ মাত্রার ভূকম্পনও হয়, তবে পরিণতি হবে ভয়াবহ। আর যদি ৭.৯ মাত্রার ভূকম্পন হয়, তবে সিলেট নগরী বলে কিছুই থাকবে না। ১০-১৫ হাজার ভবন নিমিষেই মাটির সাথে মিশে যাবে।

যদি সিলেট সীমান্তের ডাউকি ফল্টে কোনদিন ভুমিকম্প হয় তা হলে আমাদের পরিনতি কি হবে। সবচেয়ে বেশী কারা ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হবে । বেশী প্রাণহানী ঘটবে কোন শ্রেণীর মানুষের।

এক্ষেত্রে দু’শ্রেণীর মানুষকে বেছে নেয়া যায়। তারা হচ্ছেন ছাত্র-শিক্ষক ও সরকারী অফিস আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত চারদলীয় জোট সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার বয়ে গেছে সিলেটে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীন সিলেট বিভাগে শত শত স্কুল কলেজে একাডেমিক ও আবাসিক ভবন নির্মান করা হয়েছে। পূর্ত অফিসের অধীন নির্মিত হয়েছে অফিস আদালতের জন্য অনেক বহুতল ভবন। কেউ কেউ সিলেটে ভুমিকম্পে ঝুকিপূর্ন অনেক ভবন ও অফিস এর কথা লিখলেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানের একাডেমিক ও আবাসিক ভবনগুলোর কথা এড়িয়ে গেছেন। তাই ভুকিম্পের চরম ঝুকিতে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্টান ও সরকারী ভবনগুলো নিয়ে আজকের আলোচনা।

বাংলাদেশের সরকারী কাজ কি রকম হয়ে থাকে সেটা আর কারো অজানা নেই। মন্ত্রী-এমপি, শাসক দলীয় নেতা-হোতা ও ক্যাডার থেকে এমন কোন স্তর নেই যে, উন্নয়ন প্রজেক্টের ভাগ তাদের চুলোয় পড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রজেক্টই করা হয়ে থাকে ভাগ-বাটোয়ারা ও লুটপাটের নিমিত্তেই। লোক দেখানো উন্নয়ন দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করে নেয়ার অনিয়ম এখন দেশে একেবারে নিয়মে পরিনত হয়ে গেছে।

তাই সরকারী অর্থায়নে বা উন্নয়ন প্রজেক্টের আওতায় যে সব পাকা ও বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, ভুমিকম্পের সময় এগুলোতে জীবনের ঝুকি সব চেয়ে বেশী। মাত্র ক’বছর আগে পূর্তঅফিসের আওতায় নির্মিত সিলেট কালেক্টরেট ২য় ভবন মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়েছে। কিন্তু এ ভবনে আজো চলছে আইনজীবি, সহকারী আইজীবি ও পুলিশের কার্যক্রম।

বিগত চারদলীয় জোট সরকার ও বর্তমান সরকার আমলে যেসব মিক্ষা প্রতিষ্টানে বহুতলবিশিষ্ট একাডেমিক ও আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছে, সেগুলো ভুমিকম্পকালীন চরম ঝুকিপূর্ন। সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ বহুতল বিশিষ্ট সরকারী অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ-এর বহুতল একাডেমিক ভবন, নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকাধীন সিলেট মডেল স্কুল এন্ড কলেজ ভবন, সিলেট মদনমোহন কলেজ-এর বহুতল একাডেমিক ভবন, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ-এর সকল ভবন, সিলেট কৃষি বিম্ববিদ্যালয়-এর সকল হল ও ভবন, সিলেট ভেটেরিনারি কলেজ ভবন, সিলেট কারিগরি কলেজ, সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্র ভবনসহ আরো বেশ ক’টি একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হল সরকারী অর্থে ও প্রজেক্টে নির্মিত হয়েছে। আর এগুলোর নির্মান কাজে রয়েছে অনিয়ম দূর্নীতি ও লুটপাটের বিস্তর অভিযোগ। নিম্মমানের নির্মান কাজ করে আত্মসাত করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে- সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের ভবন নির্মানে যেখানে ৫০ ফুট বোরিং করার কথা, সেখানে বোরিং করা হয়েছে মাত্র ১৫ ফুট। বোরিংয়ে লোহার রডও পরিমানে দেয়া হয়েছে কম। সিলেট মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট সরকারী অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয়সহ অন্যান্য সবক’টি শিক্ষা প্রতিষ্টানে সরকারী প্রজেক্টে নির্মিত ভবনগুলোতে ‘৬০ গ্রেড’ শিক বা রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ‘নন গ্রেড’ লোহার রড বা শিক।

নির্মান সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সুত্র জানায়, ‘ননগ্রেড’ লোহার শিক (রড) ৪/৫ বছরের মধ্যেই ছাই-য়ে পরিনত হয়ে যায়। এ অবস্থায় ভুমিকম্পে এসব শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জীবন চরম ঝুকির মধ্যে রয়েছে।

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান আবহাওয়াবিদ সাঈদ চৌধুরী বলেছেন, এর আগে সিলেটে তিনবার ভূমিকম্প হয়েছে। অনেকেই চারবার দাবি করলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে তিনবার ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল সিলেট। এখানে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। সর্বশেষ বেলা ২টার দিকে আরেক দফা ভূমিকম্প হয়েছে।

বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আগে এভাবে ছোটো ছোটো ভূমিকম্প প্রায় সময়ই হয়ে থাকে।’এটি তারই লক্ষণ কিনা আবহাওয়া বিদরা সেটি স্পষ্ট করে না বললেও জানা যায়- সিলেটের অদূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ভূমিকম্পের একটি ডেঞ্জার প্লেট রয়েছে। সেই প্লেইটের কারণে ভূমিকম্প হলে সেটি মাত্রা বাড়লেও বাড়তে পারে।

শেয়ার করুন