২২ মে ২০২১


প্রভাবশালীদের দাপটে ভেস্তে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগ

শেয়ার করুন

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না ভূমিহীন ও গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণ কাজ। মুজিববর্ষে হতদরিদ্র, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গৃহায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক এ উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাব ও প্রভাবশালীদের দাপটে থমকে আছে। এর ফলে ঘর নির্মাণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠসহ বিভিন্ন গুরুত্ব নির্মাণ সামগ্রী। এর ফলে সুবিধাভোগীদের মাথা গোজার ঠাঁই পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে সেই ভূমি নিজের লিজপ্রাপ্ত দাবি করে হবিগঞ্জ সহকারী জজ আদালতে একটি স্বত্ব মামলা দায়ের করেছেন আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যক্তি। ফলে আদালত নির্মাণ কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেন। সেই সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নবীগঞ্জকে এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান কনে। এতে ৮টি ঘরের চলমান নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে ইনাতগঞ্জের দীঘিরপাড় এলাকায় সরকারি ভূমি বন্দোবস্তপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার স্বপ্নের ঘরে উঠতে পারছেন না সেই ভূমিহীন ও গৃহহীন ৮টি পরিবার। এদিকে দেরিতে হলেও নির্বাহী অফিসার বিজ্ঞ আদালতে কারণ দর্শানোর জবাব দিয়েছেন।

সূত্রে জানা যায়, সারা দেশের ন্যায় নবীগঞ্জ উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানাবিক উদ্যোগ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলায় ৩৯০ জন ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের তালিকা প্রণয়ন করলে প্রথম পর্যায়ে ১১০টি গৃহ, দ্বিতীয় ধাপে ৪০ গৃহ নির্মাণের বরাদ্ধ আসলে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে আরো ২০টি ঘর বরাদ্ধ আসলেও তার কাজ এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি। যা বিগত ২৩ জানুয়ারি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক পর্যায়ক্রমে ৮৭টি নির্মিত গৃহ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে হস্তান্তর করেন। ওই সময় ইনাতগঞ্জ বাজার সংলগ্ন দীঘিরপাড় এলাকায় সরকারের খাস খতিয়ানের ২২.৭১ শতক ভূমির মধ্যে ৮ জন ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে ১৬ শতক ভূমি বন্দোবস্ত দিয়ে ৮টি গৃহ নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেন। ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে একেকটি গৃহ নির্মাণে বরাদ্ধ রয়েছে। নির্মাণ কাজ শুরু করলে আহমদ আবুল কালাম আজাদ নামের এক ব্যক্তি ভূমি তার নামে বন্দোবস্ত দাবি করে নির্মাণ কাজে বাধা দেন। ফলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমাইয়া মুমিন তাকে একাধিকবার নোটিশ করলে তিনি উপযুক্ত কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়।

গৃহ নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে আসলে উপজেলা প্রশাসন ১ম পর্যায়ে ৬০টি ঘর ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে উদ্বোধনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ২৩ জানুয়ারি মাত্র ২৫টি ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয় উপকার ভোগীদের মাঝে। বাকী নির্মিত ঘরগুলো ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে পর্যায়ক্রমে বুঝিয়ে দিলেও ইনাগঞ্জের ৮টি ঘর আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকা পড়ে। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ওই ৮টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার।

মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক উদ্যোগ এর ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝে এ পর্যন্ত ৮৭টি পরিবারের মাঝে গৃহ হস্তান্তর করা হয়। তবে কপাল ভাঙে ইনাতগঞ্জ ভূমিহীন ও গৃহহীন ৮টি পরিবারের। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ২ শতাংশ খাস জমি প্রদান করে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া কথা রয়েছে। দুই কক্ষ বিশিষ্ট প্রতিটি আধাপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। একই ডিজাইনে বাড়িগুলো নির্মাণ করা হবে।

এদিকে আহমদ আবুল কালাম আজাদের দায়েরী মামলার জবাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মো. মহিউদ্দিন বলেছেন, আবুল কালাম আজাদের কোনো প্রকার বৈধ কাগজ পর্যন্ত নাই। যা তিনি ইতিপূর্বে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ভূমি প্রকৃত অর্থে সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত। যা এসএ ও আর এস বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড বিদ্যমান রয়েছে। উপজেলার ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের মোস্তাফাপুর মৌজার ১নং খাস খতিয়ানের ১২৪/১২০০ দাগে মোট ২২.৭১ শতক ভুমি নদী শ্রেণি হিসেবে এসএ রেকর্ডে বিদ্যমান ছিল। বিগত আরএস জরিপে উল্লেখিত ভূমি ৬৩২ দাগে আউশ শ্রেণি হিসেবে ০.০৩০০ একর, ৬৩৫ দাগে লায়েক পতিত শ্রেণি হিসেবে ০.০৬০০ একর, ৬৩৬ দাগে চারা শ্রেণি হিসেবে ০.৩৬০০ একর, ৬৩৭ দাগে আউশ শ্রেণি হিসেবে ০.২৮০০ একর ভূমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হয়।

এরমধ্যে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশের সকল ভূমিহীন ওগৃহহীনদেও জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা ২০২০ এর আওতায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মোতাবেক ১৯/২০২০-২০২১ নং স্থায়ী বন্দোবস্ত মোকদ্দমায় ইনাতগঞ্জে মো. আলফু মিয়া গং, হারুন মিয়া গং, মো. ইছব আলী গং, মো. ফরাস উদ্দিন গং, মো. আব্দুল নুর গং, মো. ছমির উদ্দিন গং, অধীর চন্দ্র দাশ গং, মো. জিলু মিয়া গং দের মাঝে বন্দোবস্ত প্রদানপূর্বক নবীগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করে দেওয়া হয়েছে। যা পরবর্তীতে তাদের নামে নামজারি করা হয়েছে।

উল্লেখিত ভূমিতে সরকারি অর্থায়নে গৃহ নিমার্ণ কাজ শুরু হলে আবুল কালাম আজাদ নামের ওই ব্যক্তি বাধা প্রদান করেন। কিন্তু সে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে। যা ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি উদ্বোধন ও নির্মিত গৃহ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে সমঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সহকারী জজ আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ আসলে তা আটকে পরে। নির্বাচনী কার্যক্রমের কারণে উপজেলা প্রশাসন আদালতের জবাব বিলম্ভে প্রেরণ করেন।

পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগের ৮টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার তাদের নামে বরাদ্ধ দেওয়া স্বপ্নের বাড়িতে উঠতে পারছেন না। এ ব্যাপারে আবুল কালাম আজাদের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, অনুমান ৭৩/৭৪ সালে স্থায়ী বন্দোবস্ত নেন। এ ছাড়া তিনি আর কোনো তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, যা বলার আদালতে বলব।

ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমাইয়া মমিন বলেছেন, উল্লেখিত ভূমি টুকু সরকারি খাস ভূমি। বিধি মোতাবেক মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ৮ জন ভূমিহীনদের মাঝে ১৬ শতক ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেওয়া হয়েছে। আবুল কালাম আজাদের দাবি অবৈধ ও অযৌক্তিক। এই জায়গা সরকার কারো নামে স্থায়ী বা অস্থায়ী বন্দোবস্ত বা লিজ প্রদান করেননি।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি খাল পাড় ঘেষা ১৬ শতক ভূমি ৮ জন ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে বন্দোবস্ত প্রদান করে উপজেলা ভূমি অফিস। পরে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ৮টি আধা পাকা ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ৪টি ঘরের আংশিক দেয়ালে কাজ শেষ হয়। অপর ৪টি ঘরের চারদিকে ইটের দেয়াল নির্মাণ কাজ শেষ করে উপরে টিন লাগানো, আস্তর ও বারান্দার কাজ করা কালে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসে। ফলে ভেস্তে যেতে বসেছে ভূমিহীনদের ৮টি বাড়ি।

শেয়ার করুন