১৮ মে ২০২১
এমজেএইচ জামিল : সিলেটে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হলো ভারত থেকে আমদানি করা করোনা ভ্যাকসিন কোভিশিল্ডের ২য় ডোজ গ্রহণের কার্যক্রম। নতুন ভ্যাকসিন না আসায় মজুদ শেষ হয়ে যায় ঈদের কয়েকদিন আগেই। টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ঈদের পূর্ব মুহুর্ত চললেও ঈদ পরবর্তী সময়ে নগর এলাকায় একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয় ভ্যাকসিন কার্যক্রম।
নগর এলাকার পাশাপাশি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায়ও ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যদিও এসব জেলার কয়েকটি উপজেলায় কিছু ভ্যাকসিন মজুদ রয়েছে তবে তা দুয়েকদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এছাড়া হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার কয়েকটি উপজেলায় কিছু ভ্যাকসিন মজুদ আছে। ৩/৪ দিনের মধ্যে দুটি জেলায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ভারতের ভ্যাকসিন-কোভিশিল্ডের ১ম ডোজ গ্রহণকারী ৯৭ হাজার জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে আমদানী করা আস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের ২য় ডোজ গ্রহণকারীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৪৩২ জন। অপরদিকে ১ম ডোজ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৩ লক্ষ ৪৪২ জন। এই হিসাবে সিলেট বিভাগে ২য় ডোজ গ্রহণের এখনো বাকী আছেন ৯৭ হাজার ১০জন। বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে এখনো মজুদ আছে ১৬ হাজার ভ্যাকসিন। এই মজুদ থেকে ১৬ হাজার জন ২য় ভ্যাকসিন নিলেও অপেক্ষায় থাকতে হবে আরো ৮১ হাজার জনকে।
ফলে ২য় ডোজ নিয়ে শংকায় রয়েছেন সিলেটের ১ম ডোজ গ্রহণকারীগন। কবে নাগাদ পুনরায় সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে আসা ভ্যাকসিনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে এর সঠিক নির্দেশনা দিতে পারছেন না কেউ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগে প্রথম চালানে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ডোজ করোনা ভ্যাকসিন আসে। এরপর দ্বিতীয় চালানে আসে আরো ১ লাখ ৯২ হাজার ভ্যাকসিন। বর্তমানে বিভাগে মজুদ আছে ১৬ হাজার ২৪০ ডোজ ভ্যাকসিন। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ১ম ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৩ লাখ ৪৪২ জন। এরপর থেকে ১ম ডোজ বন্ধ করে দেয়া হয়। সোমবার পর্যন্ত ২য় ডোজ নিয়েছেন ২ লাখ ৩ হাজার ৪৩২ জন। এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ১ম ও ২য় ডোজ মিলিয়ে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার ৮৭৪ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের ন্যায় গত ৭ ফেব্রুয়ারী থেকে সিলেটে চালু হয় করোনার ভ্যাকসিনের ‘গণটিকা’ কার্যক্রম। সেদিন থেকে সিলেট বিভাগে ১ম ডোজের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪১১ জন। এদের মধ্যে ১ম ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৩ লাখ ৪৪২ জন। এছাড়া গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২য় ডোজ নিয়েছেন ২ লাখ ৩ হাজার ৪৩২ জন। এখনো ১ম ডোজ নিতেই বাকী আছেন ৭৪ হাজার ৭৬৯ জন। এর মাঝে ২য় ডোজের বাকী রয়েছেন ৯৭ হাজার ১০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অক্সফোর্ডের ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আনতে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে গত বছরের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশের একটি চুক্তি হয়। এতে বলা হয়, সেরাম প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ৩ কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন রফতানি করবে এবং প্রতি মাসে বাংলাদেশকে ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দিবে। কিন্তু ভারত সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। সর্বসাকুল্যে ভারত থেকে ভ্যাকসিন এসেছে মোট ১ কেটি ২ লাখ ডোজ। এরমধ্যে ভারত সরকারের উপহার হিসেবে গত ২১ জানুয়ারি প্রথমে আসে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন।
সরকারের অর্থে কেনা ভ্যাকসিনের প্রথম চালানে ২৫ জানুয়ারি আসে ৫০ লাখ ডোজ, ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ আসে আরো ২০ লাখ ডোজ এবং সর্বশেষ গত ২৬ মার্চ আসে ১২ লাখ ডোজ। অর্থাৎ, ভারত থেকে কেনা ও উপহার মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ভ্যাকসিন এসেছে ১ কোটি ২ লাখ ডোজ। দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।
৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় ডোজ। ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য চুক্তির ৩০ লাখ এবং মার্চ মাসের ৫০ লাখ অর্থাৎ চুক্তির ৮০ লাখ, এপ্রিলের ৫০ লাখ ভ্যাকসিন এখনো দেশে আসেনি। চলতি মে মাসে ভারত থেকে টিকা আসার কোন সম্ভাবনা নেই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে চীন সহ অন্যান্য দেশ থেকে ভ্যাকসিন আনার জোর চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে গত বুধবার চীন থেকে ৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পেয়েছে বাংলাদেশ। যা ২৫ মে থেকে সারাদেশে দেয়া হতে পারে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার পর্যন্ত সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রথম ও ২য় ডোজ মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৭৭০ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। গত বুধবারের পর নগর এলাকায় করোনা ভ্যাকসিন-কোভিশিল্ডের কোন মজুদ নেই। যাদের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে তাদের সবার দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করতে নগর এলাকায় আরো ১৫ হাজার ডোজ ভ্যাকসিনের প্রয়োজন। নতুন ভ্যাকসিন না পাওয়ায় ১২ মে’র পর থেকে নগর এলাকায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নগর এলাকায় ৭০ হাজারেরও বেশী মানুষ ভ্যাকসিনের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করেন। এরমধ্যে থেকে ১ম ডোজ গ্রহণ করেন ৬১ হাজার ৪০০ জন ও ২য় ডোজ গ্রহণ করেন ৪৬ হাজার ৩৭০ জন। নগর এলাকায় কোভিশিল্ডের ২য় ডোজ নিতে বাকী আছেন প্রায় ১৪ হাজারের বেশী মানুষ। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন সংকটের কারণে গত ২৬ এপ্রিল থেকে সারাদেশের ন্যায় সিলেট নগর এলাকায়ও ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপরও ১৪ হাজার মানুষকে ২য় ডোজ নিয়ে শংকায় পড়তে হয়েছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: প্রেমানন্দ মণ্ডল বলেন, সিলেট জেলার কয়েকটি উপজেলায় ১ হাজার ৬৭০ ডোজ ভ্যাকসিনের মজুদ রয়েছে। তবে কয়েকটি উপজেলায় ভ্যাকসিনের মজুদ শেষ হওয়ায় কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। নতুন ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত জেলার দ্বিতীয় ডোজের জন্য ১ম ডোজ গ্রহণকারীদের অপেক্ষমাণ থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা: মোহাম্মদ নুরে আলম শামীম বলেন, আমাদের কাছে থাকা ভ্যাকসিনের মজুদ শেষ হওয়ায় সিলেট মহানগর সহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ভারতের কোভিশিল্ডের ভ্যাকসিন কবে নাগাদ আসছে সেটা নির্দিষ্ট নয়। বিভাগের যেসব উপজেলায় এখনো কিছু মজুদ রয়েছে তা ৩/৪ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ফলে ২০ তারিখের পর পুুরো বিভাগে ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে বুধবার চীনা থেকে ৫ লাখ ভ্যাকসিনের একটি চালান দেশে এসেছে। যার কার্যক্রম ২৫ মে থেকে সারাদেশে শুরু হওয়ার কথা। এ থেকে সিলেট বিভাগও কিছু ভ্যাকসিন পাবে। ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ গ্রহণকারীগণ সবোচ্চ ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত ২য় ডোজের জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যেই ২য় ডোজ গ্রহণের কথা। এই সময়ে মধ্যে কোভিশিল্ড দেশে আসবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাবেনা। আর কোভিশিল্ড ছাড়া ২য় ডোজের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যাবেনা। চীন থেকে আসা ভ্যাকসিনের ১ম ডোজের কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হতে পারে এই সম্পর্কে এখনো কোন নির্দেশনা আমাদের কাছে আসে নাই। তবে শীঘ্রই চলে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত সিলেট জেলায় ২য় ডোজ গ্রহণ করেছেন ৮২ হাজার ৯২১ জন, সুনামগঞ্জে ৩৫ হাজার ২৬৪ জন, হবিগঞ্জে ৩৫ হাজার ৫৬৭ জন এবং মৌলভীবাজার জেলায় ৪৯ হাজার ৯৮০ জন। এই হিসাবে সিলেট জেলায় ২য় ডোজ নিতে বাকী ৩১ হাজার ৯০ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় বাকী ২৬ হাজার ৫২৬ জন, হবিগঞ্জে বাকী ২২ হাজার ১০১ জন এবং মৌলভীবাজার জেলায় বাকী ১৭ হাজার ২৯৩ জন।