৫ মে ২০২১
ডেস্ক রিপোর্ট : নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় পাঁচ পুলিশসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
বুধবার দুপুরে এক হাজার ৯৬২ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়।
অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম বলেন, ‘শুনেছি পিবিআই ১৯৬০ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ অভিযোগপত্র দিয়েছে। এর পুরোটা এখনও আমি পড়তে পারিনি। এছাড়া আমি একজন সাধারণ গৃহিণী। আইনি সব বিষয় বুঝিও না। এই অভিযোগপত্র নিয়ে আমার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলব। তাদের পরামর্শ মতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার পর দুপুরে এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পিবিআই। সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই সিলেট বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, তদন্তে রায়হানকে ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু এই নির্যাতনের সঙ্গে কোনো পূর্ব বিরোধের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডটি পূর্ব পরিকল্পিতও ছিল না।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ তদন্ত, সবার সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায়হান, আকবরসহ সংশ্লিষ্টদের ফোনালাপ সংগ্রহ করেও আমরা এরকম কোনো প্রমাণ পাইনি। রায়হানকে নির্যাতনের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের কিছু পাওয়া যায়নি।’
যদিও রায়হানের মা সালমা বেগম প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, অন্য কারো ইন্ধনে পূর্ব পরিকল্পনার জেরে রায়হানকে তুলে এনে নির্যাতন করেছে পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে বুধবার সালমা বেগম বলেন, ‘পূর্ব বিরোধ না থাকলেও আমার ছেলেকে ধরে নির্যাতন করার অধিকার কারো নাই। সে অন্যায় করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ মারধর করবে কেন?’
তিনি বলেন, ‘রায়হানকে রাত একটার দিকে তুলে নেয় বন্দরবাজার ফাঁড়ি পুলিশ। সকাল ৭টার দিকে সে মারা যায়। এই ৬ ঘণ্টা ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে তাকে নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। এখানে পূর্ব বিরোধ বা তাৎক্ষণিক বিরোধ মুখ্য বিষয় নয়।’
কথা বলতে গিয়ে একসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সালমা বেগম। তিনি বলেন, ‘রায়হান অপরাধ করে থাকলে তাকে আটকের পর পুলিশ আমাদের অবহিত করবে। কিন্তু তা না করে শেষরাতে টাকা চেয়ে ফোন করানো হলো। আর রায়হানের মৃত্যুর পর নিজেদের এক দালালের মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পাঠায় পুলিশ। এসব কেন করা হলো?’
সালমা বেগম আরও বলেন, ‘ইয়াবা-ছিনতাইসহ এখন নানা বিষয়কে রায়হানের সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। রায়হান যেহেতু নেই, তাই এমন বিষয়ের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা সম্ভব নয়। এখন তো সে আর এসবের প্রতিবাদ করতে পারবে না। ফলে আমাদের দাবি একটাই, রায়হান হত্যার বিচার চাই।’
প্রসঙ্গত, নগরীর আখালিয়ার নেহারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে গত বছরের ১১ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে যায় পুলিশের একটি দল। এরপর টাকার দাবিতে তাকের রাতভর ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে দিকে তাকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে রায়হান হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে অজ্ঞাত পুলিশ সদস্যদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে তান্নি উল্লেখ করেন, ১০ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে তার স্বামী রায়হান আহমদ কর্মস্থল নগরের স্টেডিয়াম মার্কেটস্থ ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রাণীর চেম্বারে যান। পরদিন ১১ অক্টোবর ভোর ৪টা ৩৩ মিনিটে ০১৭৮৩৫৬১১১১ মোবাইল নম্বর থেকে (কনস্টেবল তৌহিদের নম্বর) তার শাশুড়ির (রায়হানের মা সালমা বেগম) মোবাইল ফোনে কল দেয়া হয়। ফোন রিসিভ করেন রায়হানের চাচা (সৎ বাবা) হাবিবুল্লাহ।
ফোনে রায়হান আর্তনাদ করে জানান, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন এবং তাকে বাঁচাতে ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে যেতে বলেন। এরপর হাবিবুল্লাহ ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে রায়হান কোথায় জানতে চাইলে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য বলেন, সে ঘুমিয়ে গেছে। আর যে পুলিশ রায়হানকে ধরেছে, তিনিও চলে গেছেন। এরপর তাকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফাঁড়িতে আসতে বলেন ওই পুলিশ সদস্য।
হাবিুল্লাহ সকাল পৌনে ১০টার দিকে আবার ফাঁড়িতে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য জানান, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের চাচা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, রায়হানকে সকাল ৬ টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। মর্গে হাবিবুল্লাহসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা গিয়ে রায়হানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখতে পান।
এজাহারে তান্নি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমার স্বামীকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে গিয়ে পুলিশি হেফাজতে রেখে হাত-পায়ে উপর্যুপরি আঘাত করা এবং হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতনের ফলে আমার স্বামী মারা গেছে।’
এদিকে সুরতহাল রিপোর্টেও নখ, ডান হাত ও ডান পায়ে আঘাতের উল্লেখ ছিল।