১৭ এপ্রিল ২০২১


ন্যায়বিচারের গুরুত্ব

শেয়ার করুন

সৈয়দ আলতাফ হোসেন খলকু : ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতাআলা বিশেষভাবে আদেশ দিয়েছেন, রাষ্ট্র বা সমাজে প্রকৃত শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার একমাত্র চাবিকাঠি হল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত। সমাজে সকল রকমের অশান্তি-বিশৃঙ্খলা, ঘুষ-দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন ইত্যাদি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ হল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করা ও তৎপ্রয়োজনে সঠিক সাক্ষ্য প্রদান করা সহ এ সম্পর্কীয় যাহা করণীয় সম্বন্ধে আল্লাহতাআলা সুরা নিসার ১৩৫নং আয়াতে বলেছেন; হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায় বিচারের উপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায় সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর, যদিও তাতে তোমার নিজের অথবা তোমার পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয় স্বজনের ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয় তাতে আল্লাহ তোমাদের চাইতে তাদের শুভাকাক্সক্ষী বেশী। অতএব তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্যাঁচানো কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও তবে জেনে রাখ যে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কর্মের খবর রাখেন, (সুরা নিসা-১৩৫)।
আল্লাহতাআলা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বর্ণনা এই একটি মাত্র ছোট আয়াতে সংক্ষিপ্তাকারে এমনভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে তার চেয়ে পরিপূর্ণ ও সঠিক নির্দেশ বা বাণী পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। একই সাথে আয়াতের মর্মবাণী মেনে না চললে তার ভয়াবহ পরিণতি সম্বন্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণও করেছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা বা আলোচনা অতি ব্যাপক। পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতির জন্য জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে এই আয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিচারকের সঠিক ভূমিকা রাখা যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঠিক একইভাবে বিচার কার্যে স্বাক্ষীর ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া কোন বিচারকের পক্ষে ন্যায়ভাবে অর্থাৎ সঠিকভাবে বিচার কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই আয়াতে সঠিকভাবে অর্থাৎ সত্য সাক্ষী দেয়ার জন্য অত্যন্ত জুরালো তাগিদ দেয়া হয়েছে। একজন মানুষের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে আপনজন ও ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র তার মাতা পিতা। মাতা-পিতার অবাধ্য না হওয়ার জন্য আল্লাহতাআলা কোরআনে স্বতন্ত্র আয়াত নাজিল করে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। এমনকি তাদের উদ্দেশ্যে উহঃ শব্দ উচ্চারণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু সত্য সাক্ষী দেয়ার ক্ষেত্রে এমন কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যদি তাহা তোমাদের ঐ আপনজন মাতা-পিতা বা তোমার নিজের অথবা তোমার ভাই-বোনসহ নিকট আত্মীয়ের কোন ক্ষতি হয় অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে যায় তবুও ন্যায় বিচারের স্বার্থে সত্য সাক্ষীই দিতে হবে।
অতএব সত্য সাক্ষী দেয়া যে কত অধিক গুরুত্বপূীর্ণ এই আদেশ থেকে বুঝা যায়। সাক্ষী দেয়ার বেলায় বলা হয়েছে আল্লাহ ওয়াস্তে সঠিক সাক্ষ্য দিতে। উদ্দেশ্য হল, কেউ যদি তার অন্তরে আল্লাহর ভয় রেখে সাক্ষ্য দেয় তবে আশা করা যায় সে সঠিক সাক্ষ্যই দিবে।
বিচারকার্যে বিচারক বা বিচারকবৃন্দকে সত্য ও ন্যায়ের উপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে; অর্থাৎ বিচারক বা বিচারকদের মনে এই দৃঢ় প্রত্যয় থাকতে হবে যে, যে কোন পরিস্থিতিতে প্রভাবিত না হয়ে যে কোন ধরনের প্রলোভন ও স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে ন্যায়ভাবেই বিচার করব। রাষ্ট্র বা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকলে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা কিছুই থাকবে না। জুলুমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করা, সবলের অত্যাচার থেকে দুর্বলকে রক্ষা করা বা নিরাপত্তা দেওয়া, চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি সকল অপরাধ ও অপকর্ম বন্ধ করার একমাত্র চাবিকাঠি হল দেশ ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করা। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকলে কেহই কোন অপরাধ করতে সাহসী হবে না এই ভয়ে যে অপরাধ করলে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং ন্যায়বিচার না থাকলে যে কেউ অপরাধ করতে ভয় করবে না। তাই সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা বজায় রাখার একমাত্র রক্ষাকবজ হল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
সাক্ষী বলতে শুধু আদালতে দাঁড়িয়ে মোখিক সাক্ষ্য দেয়াই বুঝায় না। বিচার্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রয়োজনীয় দলিলপত্র, কোন ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তার তদন্ত রিপোর্ট, বিভিন্ন আলামত, ডাক্তারী পরীক্ষা-নিরিক্ষার রিপোর্ট, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ইত্যাদি, ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সবকিছুই সাক্ষ্য হিসাবে গণ্য। কোন ফৌজদারি ঘটনার ক্ষেত্রে, ঘটনার তারিখ, ঘটনার স্থান, ঘটনার সময় সব কিছুই সঠিকভাবে আদালতকে অবগত করতে হয়।
আল্লাহতাআলা এই একটি মাত্র আয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যা কিছু করণীয় ও যা কিছু বজর্নীয় তা বলে দিয়েছেন এবং একই সাথে বিচারকার্য ন্যায়ভাবে সম্পাদন না করলে তৎসংশ্লিষ্ট সকলকে ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে বলে হুশিয়ার করে দিয়েছেন। এই একই সুরার ৫৮ নং আয়াতেও আল্লাহতাআলা নির্দেশ দিয়েছেন ঃ
‘আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার মিমাংসা করতে আরম্ভ কর তখন মিমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক’ (সূরা নিসা-৫৮), সুরা মায়েদার ১৫২ নং আয়াতেও আল্লাহতাআলা বলেছেন ঃ ‘যখন তোমরা বিচার কর তখন সুবিচার কর যদিও সে আত্মীয় হয়’ (মায়েদা-১৫২), সুরা নাহলের ৯০ নং আয়াতেও বলেছেন ঃ ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ আদেশ করেন ন্যায়বিচার ও পরোপকার করার (নাহল-৯০)।
ন্যায়বিচার করার জন্য পবিত্র কোরআনে আরও বহু নির্দেশ রয়েছে। এই সব নির্দেশ মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের জন্যই দেয়া হয়েছে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকলে শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা সব কিছুই স্থিতিশীল থাকবে।
আমেরিকার হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রফেসর সুরা নিসার এই ১৩৫ নং আয়াত নিয়ে গভীরভাবে দীর্ঘ গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদি পৃথিবীর মানুষ এই একটি মাত্র আয়াতের মর্ম উপলব্দি করে এই আয়াতের নির্দেশ মেনে চলে তবে পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচার ও অশান্তি বলে কিছুই থাকবে না। এবং এই আয়াতের ইংরেজি অনুবাদ বড় আকারের একটি ষ্টিলের ফলকে খুদাই করে লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী ভবনের প্রবেশ মুখে স্থাপন করে রেখেছেন।
অন্যদিকে মিশরের প্রতিটি আদালতে সুরা নিসার ৫৮ নং আয়াত যথা ঃ ‘যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার মিমাংসা করতে আরম্ভ কর তখন মিমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক’। এটা একটি কাষ্ট ফলকের উপর খুদাই করে লিখে বিচারকের আসনের পিছনের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা থাকে। অন্যান্য কোন মুসলিম দেশের আদালত গুলোতে এই বাণী লিখে রাখা হয় কিনা জানা যায়নি। শুধু মুসলিম দেশ নয় পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের আদালতে কোরআনের এই অমূল্য বাণী লিখে রাখা আবশ্যক বলে মনে করি। আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে যেন ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তৌফিক দান করেন এই দোয়া করি।

শেয়ার করুন