১৮ মার্চ ২০২১
শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ঝুমন দাশ আপন নামের যুবক কর্তৃক ‘কটাক্ষ’ করার অভিযোগে শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দুদের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের পর ওই এলাকায় র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রয়েছে ভয় আর চাপা ক্ষোভ।
এদিকে নিন্দনীয় এই সাম্প্রদায়িক হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার ইউএনও, ওসিসহ বিপুল সংখ্যক র্যাব-পুলিশ সদস্য এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।
এ সময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকের ঘর পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে গ্রামবাসীকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান এবং সহযোগীতার আশ্বান প্রদান করেন জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন ও পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
এসময় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের নেতৃত্বে থাকা নাচনী গ্রামের স্বাধীন মেম্বার ও গুচ্ছগ্রামের পক্ষনসহ ১৫ জনের নামের তালিকা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরা হয়।
এর আগে ফেসবুকে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে ঝুমন দাস আপন নামে ওই যুবককে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় জনতা।
কিন্তু ঝুমন দাশকে আটকের পরও আজ বুধবার সকালে তার গ্রামের বাড়ীতে হামলা লুটপাট ও ভাংচুর চালিয়েছে এলাকার মামুনুল হকের অনুসারী ও স্থানীয় বেশ কিছু উগ্র মতবাদের মানুষ।
জানা গেছে, বুধবার ভোর থেকেই স্থানীয় দাড়াইন বাজারে দিরাই উপজেলার চন্দ্রপুর, ধনপুর, শাল্লা উপজেলার কাশীপুর, আনন্দপুর থেকে কয়েকশ লোক সমবেত হয়ে ঝুমনের গ্রামের বাড়ী নোয়াগাওঁয়ে হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা গ্রামের শতাধিক ঘরে ভাংচুর চালায়। কিছু লোক ৩০/৩৫টি ঘরে ঢুকে স্টিলের আলমিরা ভেঙ্গে টাকা-পয়সা লুট করে এবং পারিবারিক অন্তত ৭টি মূর্তি ভাংচুর করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকাল ৯ টায় কয়েক শতাধিক বিক্ষুব্ধ লোক মিলে দাড়াইন বাজারের দিক হতে আমাদের গ্রামে দিকে বিভিন্ন উস্কানিমূলক শ্লোগান দিয়ে হাতে লাঠিসোটা, রামদা ও দা নিয়ে আসতে থাকে। তখন আমাদের গ্রামের নারী-পুরুষরা অন্যত্র পালিয়ে যায়। প্রায় দুই শতাধিক মানুষ নদী পার হয়ে গ্রামে ঢুকে কয়েকটি পারিবারিক মূর্তি ভাংচুরসহ লুটপাট ও তাণ্ডবলীলা চালায়।
শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান আল-আমিন চৌধুরী জানান, ‘খবর পেয়েই আমি অনুষ্ঠান থেকে দাড়াইন বাজারে চলে আসি। সেখানে অধিকাংশ বিক্ষোভকারীদের থামাতে পারলেও থামানো যায়নি লুটপাট।’
তিনি আরও বলেন, লুটপাটের উদ্দেশ্যে কিছু খারাপ লোক হামলা চালিয়েছ। এদের মধ্যে ৭০/৮০ জন বিক্ষোভকারী হাফ প্যান্ট পরে রামদা ও দা হাতে নিয়ে শতাধিক ঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। বেশিরভাগ ঘরেই স্টিল আলমিরা ভেংঙে টাকা পয়সা নিয়ে যায়। সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, উপজেলা পরিষদ, পুলিশ প্রশাসন আপনাদের নিরাপত্তায় সবসময়য় পাশে পাবেন। নির্ভয়ে আগের মত সবাই মিলে-মিশে বাড়িতে থাকুন। পুনরায় এমন ঘটনা ঘটবে না।
এদিকে শতভাগ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘যারা ঘটনার সাথে জড়িত তাদের পরিচয় বিবেচ্য নয়। তারা আইনের কাছে অপরাধী। তাদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। ভবিষ্যতে যাতে কোন লোক এমন ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায় এমন ব্যবস্থা করবো। যতক্ষণ পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক হচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত র্যাব ও পুলিশ সতর্ক অবস্থায় আপনাদের পাশে নিয়োজিত থাকবে।’ তিনি সবার প্রতি নির্ভয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে বাড়িতে বসবাসের আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, দিরাই উপজোয় হেফাজত ইসলামের আমীর বাবুনগরী ও মামুনুল হকের আগমনকে ঘীরে শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস ফেসবুকে আপত্তিকর বিরুপ মন্তব্যে দিরাই-শাল্লার বেশ কয়েককটি গ্রামে উত্তেজনা দেখা দেয়। গত রাতে তারা সংঘঠিত হতে চায়, কিন্তু শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান, শাল্লা ও দিরাই উপজেলার ইউএনও এবং ওসি তাদেরকে নিভৃত করে ও ঝুমনকে আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। এরপর এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত হয়।
তিনি বলেন- সকাল ৮ টায় দিরাই উপজেলার কয়েকটি গ্রাম থেকে যুবক কিশোর লাঠিসোটা নিয়ে আসতে থাকে। তাদের আগমন দেখে নোয়াগাঁও গ্রামের নারী-পুরুষ গ্রাম ছেড়ে হাওরে চলে যায়। যার কারণে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। হামলাকারীরা ঘরে থাকা পারিবারিক মূর্তিসহ ভাঙচুর চালায় এবং সম্পদের ক্ষতি করে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর মেরামতে আর্থিক সহযোগীতা করা হবে। কোন অশান্ত পরিবেশ তৈরী হবে না। আমরা সেই নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা কেই রেহাই পাবে না। জনপ্রতিনিধিসহ র্যাব,পুলিশ, ইউএনও, এসিল্যান্ড সবাই আপনাদের পাশে আছে।
ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল জানান, এই হামলার পেছনে স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতিকারীদের হাত থাকতে পারে।
গ্রামের মুদি দোকানদার রঞ্জনা চৌধুরী জানান, ‘আমার দোকানের মালামাল টাকা পয়সা হামলাকারীরা লুট করে নিয়ে গেছে। এসময় আমরা আমাদের দুই মেয়ে সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ স্থান হাওরে চলে যাই।
অসীম চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘হামলাকারীরা গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় তাণ্ডবলীলা চালায়। এসময় আমার বাড়িঘর ভেঙে একশত বছরের পুরাতন কষ্টি পাথরের মূর্তি নিয়ে যায় হামলাকারীরা।’
উল্লেখ্য, হেফাজত নেতাদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্যকারী ঝুমন দাশ আপন নোয়াগাঁও গ্রামের গোপেন্দ্র দাসের ছেলে। তার বিরূপ মন্তব্য নিয়ে এলাকায় সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়। মঙ্গলবার রাতে নোয়াগাও গ্রামের কয়েকজন হিন্দু লোকের সহায়তায় শাসকাই বাজার থেকে তাকে পুলিশে তুলে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ঝুমনকে জেলহাজতে প্রেরণ করে শাল্লা থানা পুলিশ।
এদিকে ঘটনাস্থল নোয়াগাঁও গ্রাম ও আসপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। র্যাব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে খাবার বিতরণ করেছে। এলাকার পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।