১ জানুয়ারি ২০২১


‘বিষের’ যন্ত্রনায় কাতর সিলেট

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : ২০২০ সাল যেন সিলেটবাসীর জন্য একটা যন্ত্রনার বছর। অনেকটা বিষের মতো ছিল। শান্তির জনপদ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত সিলেটকে ডুবিয়েছিলো লজ্জা সাগরে। শুধু তাই নয় এই বিশেই সিলেট হারিয়েছে তাঁর গর্বিত সন্তানদের। এমসির ছাত্রাবাস থেকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি; মুলত এই দুই কারণই ‘বিষের যন্ত্রনায়’ কাতর ছিল পূণ্যভুমি সিলেট। আলোচনা-সমালোচনায় সিলেটের নাম আসে বারবার।

আধ্যাত্মিক নগরীতে জঙ্গি হামলার আভাস আর গেরেন্ডার মেশিনকাণ্ডে ছিলো আলোচিত। একের পর এক ন্যাক্ষারজনক ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। যা সিলেটবাসীকে ভাবিয়েছে অনেক। উত্তাপ আর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন ছিলো সিলেটবাসী।

রাত পুহালেই নতুনের কেতন উড়িয়ে পূর্ব দিগন্তে উদিত হবে নববর্ষের নবপ্রভাতের নবীন সূর্য। একুশ সালে পা রাখবে বাংলাদেশ। বিশের কেমন ছিল সিলেট? পাঠকদের জন্য তা তুলো ধরা হলো-

এমসি ছাত্রাবাসে নববধূকে ধর্ষণ
এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছিলো ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। ওইদিন সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক নববধূকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। ঘটনার পরদিন সকালে ধর্ষিতার স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে নয় জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ভিকটিমের জবানবন্দি রেকর্ড করেন সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের হাকিম শারমিন খানম নিলা। সর্বশেষ ধর্ষণ মামলার আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে গ্রেপ্তার আট আসামির মধ্যে ৬ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ ও ২ জনের বিরুদ্ধে সহায়তার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ২৯ সেপ্টেম্বর নগরীর দাড়িয়াপাড়া এলাকায় বাসার ছাদে নিয়ে ১৪ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ করে স্থানীয় রাকিব হোসাইন নিজু নামের এক তরুণ। ২৩ সেপ্টেম্বর নগরীর শিবগঞ্জ লামাপাড়ার শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তৃতীয় তলার পরিত্যক্ত কক্ষে ১৬ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আলী। ঘটনার দিনই পুলিশ মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করে। ৫ অক্টোবর রাতে মেয়েকে ধর্ষণ অপহরণের প্রতিবাদ করায় ধর্ষক শামীম আহমদও তার লোকজন মেয়ের বাবাকে ধরে নিয়ে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শামীমসহ ৪ জনকে আটক করে পুলিশ। ৩ অক্টোবর নগরীর শামীমাবাদ এলাকার একটি বাসায় ৫ সন্তানের জননীকে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ধর্ষক দিলওয়ার তার দুই সহযোগীকে নিয়ে ওই নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে বলে পুলিশ জানায়। এছাড়া সিলেটের বিশ্বনাথে কিশোরীকে মসজিদের ইমাম কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কানাইঘাটে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে রিয়াজ উদ্দিন নামে এক ইমামকে আটক করেছে পুলিশ।

পুলিশি নির্যাতনে হত্যা
এমসির ঘটনার রেশ না কাটতেই ঘটে আরেকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা। আতঙ্কিত হয়ে ওঠে শান্তির জনপদ সিলেট। দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এবছরের ১১ অক্টোবর রাতের আধাঁরে সিলেটের বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আখালিয়ার যুবক রায়হান আহমদকে (৩৪) ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের আরও তিন সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়েছিলো বলেও অভিযোগ রায়হানের পরিবারের। জানা যায়, ১১ অক্টোবর ভোর ৩টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে রায়হান উদ্দিনকে আনা হয় বন্দরবাজার ফাঁড়িতে। সেখানে ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়ার নেতৃত্বেই তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতেই রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় হেফাজতে মৃত্যু আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

এরপর সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্তকমিটি এই হত্যাকান্ডের সাথে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা পায়। ১৩ অক্টোবর বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এএসআই আশেকে এলাহী, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুণকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিলেট পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হলেও ফাঁড়ি ইনচার্জ আকবর পালিয়ে যান। ৯ নভেম্বর কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে আকবরকে আটক করে পুলিশ। এঘটনায় অভিযুক্ত সকল আসামীর রিমান্ড নিয়েছে পুলিশ। রিমান্ড শেষে সবাই জেল হাজতে আছে। মামলার তদন্তকারি সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে শিগগির এ মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

করোনার তান্ডব
চলতি বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও ৫ এপ্রিল সিলেটে করোনাভাইরাসের রোগী চিহ্নিত হন। এরপর থেকেই সিলেটজুড়ে সংক্রমিত হচ্ছে হাজার-হাজার মানুষ। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দেন একের এক।

২৬ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষনা করে সরকার। এরপর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে অনেকেই শহর চেড়ে চলে যান গ্রামে। তিন মাসেরও বেশি সময় ঘরে বসে থাকায় আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় জীবন ঝুঁকি নিয়েই মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন এখন।

নিরুত্তাপ রাজনীতি
২০২০ সাল। নিরুত্তাপ সিলেটের রাজপথ। করোনার থাবায় স্থবির ছিলো রাজনৈতিক কর্মকান্ড। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ জোট-মহাজোটের রাজপথে উত্তাপ ছড়ানোর মতো তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। সভা-সমাবেশ বা মিছিল করতে দেখা যায়নি সরকার কিংবা বিরোধী পক্ষকে। বলা চলে এবছরে রাজনীতি ভার্চুয়াল মাধ্যম কিংবা নেতাদের ড্রয়িংরুমে বন্দি ছিলো। তবে বছরের শেষ দিকে এসে ভাস্কর্য ইস্যুতে ক্ষমতাসীনেরা রাজপথে কিছুটা উত্তাপ ছড়ালেও তা থিতু হয়নি। করোনার শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে কিছু ত্রাণ কার্যক্রম চালালেও পরে ভার্চুয়াল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। করোনাকালিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান ‘জনতার মেয়র’ খ্যাত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, বিএনপি চেয়াপার্সনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আব্দুল হক (এমএহক)। এছাড়াও আওয়ামীলীগ বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী করোনায় আক্রান্ত হন।

বোমাতঙ্ক ও জঙ্গি গ্রেপ্তার
এবছরের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর চৌহাট্টায় পুলিশ সার্জেন্ট চয়ন নাইডুর মোটরসাইকেলে অজ্ঞাতদের ‘গ্রাইন্ডিং মেশিন’ রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে বোমাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২০-২২ ঘণ্টা পর সেই আতঙ্কের অবসান ঘটায় সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল টিম। এঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১০ আগস্ট দিবাগত রাত থেকে শুরু হয় জঙ্গি আতঙ্ক। এদিন রাত থেকে শুরু করে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত চরম অস্থিরতায় কেটেছে নগরবাসীর। পরে জঙ্গিদের দুই আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই আতঙ্ক কাটে।

অভিযানকালে নগরীর মিরাবাজার উদ্দীপন-৫১ নম্বর বাসা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ ‘সিলেট আঞ্চলিক কমান্ডার’ নাইমুজ্জামান নাইমকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তার তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয় আরো ৪ জনকে। এছাড়াও শহরতলির টুকেরবাজার এলাকা থেকে আটক হয় ৩ জন। এই ৫ ‘জঙ্গি’ হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে হামলার পরিকল্পনা করছিলো। পরবর্তীতে এই ৫ জঙ্গির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ও র‌্যাব বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও জঙ্গি তৎপরতায় ব্যবহৃত কম্পিউটার উদ্ধার করে।

১৫৬ ঘন্টার পরিবহণ ধর্মঘট
মৃত্যুপুরি পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়াসহ ছয় দফা দাবিতে সবশেষ ২২ ডিসেম্বর থেকে টানা তিন দিন সিলেট বিভাগে পরিবহন ধর্মঘট পালন করেছে পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। পৃথক দাবিতে ২১ ডিসেম্বর থেকে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট পালন করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মালিকদের সংগঠন। এর আগে আরেক দফা ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট পালন করে পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সবমিলিয়ে ডিসেম্বর মাসেই সিলেটজুড়ে ১৫৬ ঘন্টার ধর্মঘট পালিত হয়েছে। ধর্মঘটের কারণে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। উল্লেখ, পাথর উত্তোলন বন্ধে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উপজেলা প্রশাসন অস্থায়ী শ্রমিকদের পাথর কোয়ারি থেকে নিজ নিজ এলাকায় পাঠিয়ে দেয়। পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় পাথর উত্তোলন। এর আগে ২০১৪ সালে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে সবধরনের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত। এতে পুরোপুরি পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই পাথরখেকোরা স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়ে মাঠে নামে।

৬৯ ঘন্টা বিদ্যুৎহীন সিলেট
বছরজুড়েই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় নগরে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। ১৭ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড (পিজিসিবি) ১৩২/৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সরবরাহ উপকেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। পরে দমকল বাহিনীর সাতটি ইউনিট এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও দু’টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার, সার্কিট ব্রেকার এবং কন্ট্রোল প্যানেল পুড়ে যায়। এতে পুরো সিলেট বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।

টানা ৫৫ ঘণ্টা পর নগরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ১৯ ডিসেম্বর কুমারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড (পিজিসিবি) ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের ৩৩ কেভি বাসে জরুরি মেরামত কাজের সময় শ্রমিক দুর্ঘটনার কারণে টানা ১৪ ঘন্টা পুরো সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। সবমিলিয়ে দু’ফায় ৬৯ ঘন্টা বিদ্যুৎহীন ছিল পুরো সিলেট। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে এবছরে নগরবাসীকে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

শেয়ার করুন