১০ নভেম্বর ২০২০


আদালতের রায় বাংলায়

শেয়ার করুন

আদালতের রায় বাংলায় লিখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে অনুবাদক নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করা যায়। তিনি বলেন, যদি কেউ রায় বাংলায় লিখতে না পারেন, ইংরেজিতে লেখেন কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সেই রায়টা বাংলায় অনুবাদ করে যেন প্রচার হয় সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে মামলার রায়গুলো ইংরেজিতে দেওয়া হয়, অনেকে সেই রায় বুঝতে পারে না; আইনজীবীরা যেভাবে বোঝান সেভাবে বুঝতে বা জানতে হয়। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজিতে লিখতে লিখতে অনেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাই বাংলাতেই রায় লিখতে হবে, এ ধরনের চাপ প্রয়োগ ঠিক নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এগুলো অনুবাদ করা এমন কোন কঠিন কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি রাজধানীতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন।
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বলাবলি হচ্ছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে আদালতের রায় বাংলায় প্রচার করার জন্য। কিন্তু এবার খোদ প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে তাগিদ দেওয়ায় এর গুরুত্ব বেড়ে গেছে। আদালতে মামলার রায় ইংরেজিতে লিখার ইতিহাস খুবই পুরনো। হুট করে এই ধারার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয় বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তারা বলেন, আইনের ধারাগুলো ইংরেজিতে হওয়ায় এবং বাংলা ভাষায় লেখা আইনের বই না থাকায় সর্বোচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। তাদের মতে, সোজা ভাষায় বললে নিঃসন্দেহে বাংলায় রায় লেখাটা কঠিন। আমাদের আইন ও বিচার ব্যবস্থার বাস্তবতা হচ্ছে- দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, কার্যবিধিসহ অধিকাংশ মূল আইন প্রণীত হয়েছিলো বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা। আর সেটা প্রবর্তিত হয়েছিলো তাদেরই মাতৃভাষা ইংরেজিতে। আর সেই শাসকেরা আদালতের যে বিন্যাস সাজিয়ে দিয়েছিলো, এখনও তা বহাল আছে। বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা বৃটেনে বিকশিত কমন ল’ সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের আইন শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থায় মূলত ইংলিশ আইনের নীতিমালা পড়ানো হয় এবং অনুসরণ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে আমরা কতোটা বাংলাদেশের করতে পেরেছি, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। একইভাবে স্মরণ করা যেতে পারে, শীতের দেশের বিচারক ও আইনজীবীরা যে পোশাক পরেন সেই পোশাক পরে আমাদের এই রোদ, বৃষ্টি, গরমের দেশের বিচারক আইনজীবীদেরও গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। তাই সর্বপ্রথম ঔপনিবেশিক আমলের গ্যাঁড়াকল ভাংতে হবে।
সত্যি বলতে কি, আইনের প্রায় সব প্রামাণিক ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থই ইংরেজিতে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনের মূল বয়ান ইংরেজিতে, ল রিপোর্টগুলো ইংরেজিতে। সেই সঙ্গে আছে পরিভাষার সমস্যা। অনেক আইনের মূল বয়ানের কোন কোন ধারায় অর্ধপৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠা জুড়ে একটি বাক্যে আইনের ভাষ্য বর্ণিত হয়েছে; যা জটিল ও দুর্বোধ্য। এই প্রেক্ষাপটে বলতে দ্বিধা নেই যে, আইনের ভাষা দিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে এক দুর্ভেদ্য ও দুর্বোধ্য দেয়াল তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই দেয়াল ভেদ করে কতোজনে আইনের ভাষাকে রপ্ত করতে পেরেছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তার মানে এই নয় যে, ঔপনিবেশিক ‘প্রেতাত্মা’র কবলেই আমাদের চিরকাল থাকতে হবে। সময় বদলাচ্ছে। সচেতন হচ্ছে মানুষ। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর সুবিধার জন্য মামলার রায় বাংলায় প্রচার করার পাশাপাশি আইন বিষয়ক গ্রন্থ বাংলায় তৈরির উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবী। এতে করে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতিও যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে বলে আমরা মনে করি।

শেয়ার করুন