৯ জুলাই ২০২০
বর্ষার থৈ থৈ পানি এখন চারদিকে। হাওর-বিল-নদী পানিতে টইটম্বুর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। নানা ধরনের দুর্ভোগে রয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। আর এর মধ্যেই নীরবে নিভৃতে ঘটে চলেছে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। সেটা হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু। যদিও সারা বছর ঘটনাটি বিভিন্ন স্থানে ঘটছে, তবে বর্ষায় এর মাত্রা বেড়ে যায়। এ বছরের বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। দেশের সর্বত্রই এই দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে। এমনকি বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগে মৃত্যুর চেয়ে এখানে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হারই বেশি। এই মর্মান্তিক ঘটনা রোধে সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি হলেও দিন দিন মানুষ আরও বেশি অসচেতনই হচ্ছে বলে মনে হয়।
নদীমাতৃক এই দেশে নদ-নদী, হাওর-বাওর, বিল, ডোবার ছড়াছড়ি। মানুষের জীবন জীবিকা, সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে নদ-নদী হাওর বিল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী মূলত এগুলো নিয়েই বসবাস করছে বছরের পর বছর। আর তাই তারা এগুলোর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবে বা মানিয়ে নেওয়া উচিত, এমনটি আশা করাই যায়। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় পক্ষান্তরে সেটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হয়, পানিতে ডুবে প্রতি বছর মারা যায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ। এর ৯০ ভাগের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ৫০ জনের বেশি মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে। জানা গেছে, মৃত্যুর ঘটনার ৬৩ শতাংশই ঘটে সকাল ৯টা থেকে বিকেল তিনটার মধ্যে। কারণ এই সময় বাবা মা বা অভিভাবক বিভিন্ন গৃহস্থালীর কাজে ব্যস্ত থাকেন। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। আর এশিয়ায় প্রতি ৪৫ সেকে-ে এক শিশুর পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। জানা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। শিশু মৃত্যুর ৮০ ভাগই ঘটে বাড়ি থেকে ২০ মিটারের মধ্যে পুকুরে পড়ে।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাকে এক ধরনের ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। এই মহামারি ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। আর প্রথমে জরুরি হচ্ছে, সাঁতার শেখা। সাঁতার না জানার কারণে অনেক শিশু যেমন মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে, তেমনি মারা যাচ্ছে বড়রাও। আর পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা গেছে ১৮ বছরের উর্ধে অনেকেই মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে। আমাদের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে, নদী হাওরের দেশের মানুষ সাঁতার জানে না বা শেখার আগ্রহ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাঁতারের মতো উৎকৃষ্ট-কার্যকর আর কোন ব্যায়াম হতে পারে না। তাই সাঁতার শেখা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা যায় কিনা ভেবে দেখা দরকার। সর্বোপরি অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এই দুর্ঘটনারোধে।