২৮ জুন ২০২০
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ফল আনারসের ফলন বাড়ছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন পাহাড়ি ও সমতল ভূমি আনারস চাষের উপযোগী হওয়ায় আগ্রহ নিয়ে চাষ বাড়াচ্ছেন চাষিরা। তবে বাগান মালিক ও চাষিরা বলছেন, ফলন ভালো হলেও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে তাদের ফসল। দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় বিভিন্ন হাট-বাজার এখন আনারসের মিষ্টি গন্ধে মুখরিত। জেলার মোকামবাজার, শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতাগাঁও, মুছাই এলাকা, মির্জাপুর, ভূনবী, ভৈরববাজার, ডলুবাড়ি, রাধানগর, মোহাজেরাবাদ এলাকার বেশিরভাগ বাজারে আনারস উঠেছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বিমানঘাঁটি, মাধবপুর, মাঝেরছড়া, পুরানবাড়ি ও আদমপুর এলাকার পাহাড়ি ও সমতল ভূমিতে বেশি আনারস চাষ হয়। ওইসব এলাকা থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পিকআপ, জিপ ও ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে শ্রীমঙ্গল শহরের নতুনবাজার এলাকায় বিভিন্ন আড়তে আনারস, লেবু, কাঁঠাল নিয়ে আসছেন বাগানচাষিরা। সেখান থেকে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসব ফল কিনে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, পাড়ামহল্লায় বিক্রি করছেন চড়া দামে। কিন্তু বাগান মালিকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দেখা গেছে, আড়তে বড় সাইজের প্রতি পিস আনারস বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। মাঝারি সাইজের প্রতি পিস আনারস বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা। ছোট সাইজের প্রতি পিস আনারস বিক্রি হচ্ছে ১২-১৫ টাকা।
কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা দামে। সেটা খুচরা বাজার বিক্রি হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকায়। আবার পাকা কাঁঠাল বিক্রি হয় ২০০ টাকায়। লেবু আড়তে সাইজ বুঝে ৫ টাকা থেকে শুরু করে ৮ বিক্রি হচ্ছে। আবার খুচরা বাজারে ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল নতুন বাজার এলাকায় আনারসসহ মৌসুমি ফলমূলে ভরপুর থাকলেও বাজারগুলো ক্রেতা শূন্য। করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ ঘরবন্দি। দূর দূরান্ত এলাকার কোনও পাইকারি ব্যবসায়ী নেই বললেই চলে।
আনারস ব্যবসায়ী আয়াত আলী বলেন, ‘এবার উৎপাদন ভালো। তবে করোনাভাইরাস থাকায় ব্যবসা কম। করোনা না থাকলে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য খুব ভালো করতে পারতাম।’
ক্রেতা কম থাকায় সংকটে মৌলভীবাজারের আনারস চাষিরা
শ্রীমঙ্গল আনারস চাষি ও বাগান মালিক আব্দুল বাছিত, আব্দুল মালেক জানান, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আনারসের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদিত আনারস বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা সদর ও সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ বিক্রি হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত নয়। গত বছর এসব আনারস রাজধানী ঢাকা কাওরানবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বেচাকেনা হতো। এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে পাইকারি ব্যবসায়ী আসতে পারছেন না। পাশাপাশি আনারস, লেবুও ব্যাপক পরিমাণে ঢাকার আড়তে পাঠানো যাচ্ছে না।
শ্রীমঙ্গল জালালিয়া সড়কের বাসিন্দা আনারস চাষি ও বাগান মালিক মো. শাহেদ আহমদ জানান, এবছর আনারসের ফলন হলেও ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আনারসের চাহিদা থাকলেও করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকটাই কমে গেছে। কারণ ব্যবসায়ীরা আসতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘বাগানে আনারস পেকে যাওয়ায় এবং পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এবছর বাগানের খরচ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’
শ্রীমঙ্গল নতুন বাজারে মেসার্স নেপাল আদিত্য এন্ড সন্সের মালিক নির্মল আদিত্য বলেন, ‘অন্যান্য বছর ঢাকা, নরসিংদী, বগুড়ার আনারস ব্যবসায়ীরা আসতেন। লকডাউনের কারণে কেউ আসতে পারেননি। এছাড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে এবার কাস্টমার না থাকার আনারস, কাঁঠাল ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা যাচ্ছে না। বর্তমানে এসব ফল সিলেট বিভাগে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে বড় সাইজের আনারস প্রতি পিস ৩৫-৪৫ টাকা, মাঝারি সাইজ ৩০-৩৫ টাকা, আর ছোট সাইজ প্রতি পিস ৮ থেকে ১০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। খুচরা কিনতে গেলে বাজারে বড় সাইজ হালি ২০০ টাকা, মাঝারি সাইজ হালি ১৫০ টাকা আবার ছোট সাইজ হালি ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে পাইকার নাই। আবার অন্যদিকে আনারস বাগানে দ্রুত পেকে যাওয়ার কারণে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আনারস, কাঁঠাল ও লেবু পচনশীল থাকায় বেশি দিন রাখা যায় না। শ্রীমঙ্গল যদি কোল্ডস্টোরেজ থাকতো তাহলে বছরে কোটি টাকা আয় হতো।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী জানান, জেলায় ১২০১ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৬২৫ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। আনারস ফলন সবসময় ভালো হয়। তবে চাষিরা দাম পাচ্ছেন না করোনাভাইরাসের কারণে।
তিনি আরও বলেন, ‘কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় মৌসুমি ফল চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলে কোল্ডস্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে আনারস, লিচু, কাঁঠাল ও লেবুর চাহিদা বেশি থাকতো। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। দ্রুত যেন শ্রীমঙ্গল কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন হয়।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে উপজেলাজুড়ে আনারস ও লেবু প্রচুর উৎপাদন হয়। সিলেট বিভাগসহ সারাদেশে সরবরাহ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যখন উৎপাদন বেশি হয় তখন কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় কৃষকরা পর্যাপ্ত মূল্যে পায় না। পচনশীল দ্রব্য দ্রুত হন্তান্তর করতে হয়। এখন একটা কোল্ডস্টোরেজ জন্য খুবই প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো।’