৯ মে ২০২০


দক্ষিণ সুনামগঞ্জে সরকারী ডাক বাংলো ময়লায় পরিত্যক্ত

শেয়ার করুন

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ইতিহাস আশ্রিত অনেক স্থাপনা আরনো খবর। তবে নতুন খবর হচ্ছে ধ্বংসের মিছিলের সারি লম্বায় এবার যোগ হচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ডাক বাংলো। উপজেলার পাগলাবাজারে মূল কেন্দ্র অবস্থিত এই বাংলো তার শত বছরের ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে কালের মহাপরিক্রমায়।দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ইতিহাস আশ্রিত অনেক স্থাপনা আমাদের দেশে আজ হুমকির মুখে। যদিও এটা অনেক পুরনো খবর। তবে নতুন খবর হচ্ছে ধ্বংসের মিছিলের সারি লম্বায় এবার যোগ হচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ডাক বাংলো। উপজেলার পাগলাবাজারে মূল কেন্দ্র অবস্থিত এই বাংলো তার শত বছরের ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে কালের মহাপরিক্রমায়।

ব্রিটিশ শাসনামালে নির্মিত এই বাংলো অব্যবহৃত থাকায় বলতে গেলে পুরোপুরি নষ্ট হয়েই গিয়েছিলো। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে তত্‍কালীন পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল আলম নিক্কুর উদ্যোগে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে পুরনো আদলে পুনঃনির্মান করা হয় চৌচালা বিশিষ্ট্য এই ভবনের। ভবনটি আশপাশে প্রচুর খালি জায়গা। আনুমানিক ১ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই বাংলোর খালি যায়গা বাংলোর শ্রী বর্ধন করার কথা থাকলেও ক্রমশ ডাস্টবিন বুথে পরিণত হচ্ছে। অঘোষিত একটা পাবলিক টয়লেট বললেও ভুল হবে না। বাজার পরিচালনার জন্য নাম মাত্র একটি কমিটি থাকলেও তাদের চোখ নেই বাংলোর দিকে, তাই আঁধারে থেকেই যাচ্ছে কালের সাক্ষী এই সরকারী ডাক বাংলোটি।

স্থানীয় প্রবীণ লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আপন ঐতিহ্যের গড়িমায় উদ্ভাসিত এই বাংলোটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার বুক পেতে নিয়েছিল বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে। দেশের বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিম, প্রয়াত রাজনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ সহ অনেক জ্ঞাণী-গুণী ব্যক্তিবর্গের সেকেন্ড-মিনিট-ঘন্টার আশ্রয়স্থল এই বাংলো। কিন্তু সরকারী এই সম্পদ আজ পরিচর্চার অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। মেহগনি, সেগুণ, জাম আর অর্ধশত বছরের পুরনো বিশালাকার দুটি রেইন্ট্রি গাছ শুধু ডাক বাংলোকেই নয় সারা বাজারকেই বৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছাস থেকে ছাতার মত আগলে রেখেছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন সন্ধ্যা নামে সারা বাজার বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হলেও বিদ্যুতের আলো জ্বলেনা ডাক বাংলো প্রাঙ্গনে। ফলে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পাল্টে যায় তার দৃশ্যপট। অন্ধকারে ডুবে যায় বাংলো প্রাঙ্গণ।

প্রাচীন এই স্থাপনাটি সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপদের দায়ীত্বে থাকলেও এদিকে যেন ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই তাদের। সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে নেতৃত্বও পাল্টে। নির্বাচনী ইশতেহারও আসে শত শত। কিন্তু কারো মুখে কোন দিনই ডাক বাংলো উন্নয়নের কথা শুনিনি। কোন কোন সময় স্থানীয় যুবকদের বিনোদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে এই ডাক বাংলো। তাদের হাত ধরে সামনের দিকটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলেও আঁধার ও নোংরামি ঢেকে রাখে পেচনের দিকটা। কোনও কোনও শীতে যদিও রাতের আঁধারে আলো জ্বলে ব্যাডমিন্টন কিংবা ফুটবল খেলার সময় তবে তা ক্ষণিকের জন্যই।

ডাক বাংলোর বর্তমান অবস্থা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকে ক্ষোভের সাথে সংশয় প্রকাশ করে বলেন এখনি যদি এটি রক্ষার কোন কার্যকরী প্রদক্ষেপ না নেওয়া হয় অদূর ভবিষ্যতে ভূমি খেকুদের পেটস্ত হতে পারে সরকারী এই সম্পদ। তারা চাইছেন, বাংলোটিকে যেনো সরকারীভাবে একটু শ্রীবর্ধন করা হয়। চারদিকের ময়লা পরিষ্কার করে লাইটিং করে আলোকিত করার তাগিদ দেন এলাকাবাসী। কালের স্বাক্ষী এই বাংলোটিকে সরকারী বিশ্রামাগার করা যেতে পারে বলেও মতামত দিয়েছেন অনেকে। আবার চারদিকের পরিবেশের উন্নয়ন করে বৈকালিক বিনোদনের স্থান করে দেওয়ার কথাও অনেকে বলেন।

এ প্রসঙ্গে সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ বদরুল আলম টিপু বলেন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বিশেষ করে পাগলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত্‍ পাগলা বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সঠিক রক্ষনাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা। সম্মিলিত উদ্যোগে বাংলোটিকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার খুব দরকার। তিনি আরো বলেন- সবার আগে যেটার প্রয়োজন তা হচ্ছে চারপাশে নোংরা আবর্জনায় ভরা। এগুলো পরিষ্কার করে দৃষ্টি নন্দন করা। কেউ যেনো প্রস্রাব পায়খানা না করে তার জন্য একটি ভাল গেইট করে রাখা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, ডাক বাংলোর সামনে সড়ক ও জনপদের যায়গার উপর গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। ফলে ঐসব স্থাপনার আড়ালে পড় আছে ডাক বাংলোটি। ডাক বাংলোর শ্রী বর্ধনে ঐসব দোকান উচ্ছেদ প্রয়োজন।

পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল আলম নিক্কু বলেন, পাগলা বাজার ডাক বাংলো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান সহ ঐ সময় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশের অনেক বড় বড় ব্যক্তিদের পদার্পন ঘটেছিলো। এখানে অনেক বড় বড় জনসভা ও সমাবেশ হয়েছিল। তৎকালীন সময় এটার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ময়না মিয়া নামের সুহৃদয় এক ব্যক্তি। তিনি মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নব্বই দশকে এটা পরিত্যাক্ত হতে থাকে। এবং এক সময় আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। আমি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আমার অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করি। ১/১১ এর সময় এই স্থাপনা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে পুণরায় পরিত্যাক্ত ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। এটার সংস্কার জরুরি।’

পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল হক বলেন, ‘বাংলোটি সড়ক ও জনপথের। আমি মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে আলাপ করবো। চেষ্টা করবো মন্ত্রী মহোদয়ের মাধ্যমে কাজটি করানোর।’

সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপথের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডাক বাংলোটি আমাদের স্থানীয় কর্মচারীরা দেখে রাখেন। এটি খুবই নোংরা। নির্বাচনের সময় আসলে আমরা এটাকে কিছু সংস্কার করি। প্রধান গেইট বন্ধ থাকে সব সময়। বাংলোটির কথা আমাদের মাথায় আছে। স্থানীয় এলাকার মানুষও খুব বাজেভাবে বাংলোটিকে ব্যবহার করেন। আমরা বাংলোটি পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করবো।’

শেয়ার করুন