৯ মার্চ ২০২০


সম্প্রীতির নজির : মৌলভীবাজারে মসজিদের কাছে মন্দির

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মসজিদ আর মন্দির পাশাপাশি। সেখানে দুই ধর্মের অনুসারিদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। সব ধর্মের আচারই পালন হচ্ছে নিয়মমতই। কেউ কাউকে বাধা তো দেনই না, যতটুকু পারেন সহায়তা করেন। যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই নজির।

দৃষ্টান্ত হয়ে মসজিদের মিনার আর মন্দিরের চুড়া এক সাথে মিশে আছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ভৈরবগঞ্জ বাজারে। ৭৩ বছর ধরে একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ভৈরবগঞ্জ বাজারের ভৈরব মন্দির আর মাজদিহি জামে মসজিদ। যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

শুধু কি তাই, হিন্দু মুসলমানদের ভাতৃত্ব বন্ধনের শিক্ষা দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভাবেই দুই ধর্মের মানুষ এখানে যারযার ধর্মকর্ম পালন করে আসছেন।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, প্রায় দুইশত বছর আগে এখানে মন্দির স্থাপিত হয় এবং প্রায় ৭৩ বছর বছর আগে মন্দির। গত ৭৩ বছরে অনেক সাম্প্রায়িক উস্কানি দেশব্যাপী ঘটলেও তার প্রভাব এখানে পড়েনি। দুই প্রতিষ্ঠান একসাথে প্রায় ২৫ গজের মধ্যে ব্যবধানে সহাবস্থানে অধিষ্ঠিত রয়েছে। প্রথমে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন দেয়াল বা স্থাপনা ছিলনা তবে বর্তমানে দেয়াল উঠেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে দুই ধর্মের মানুষ কাছাকাছি অবস্থানে তাদের ধর্মকর্ম পালন করে গেলেও অদ্যাবদি এখানে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টের ঘটনা ঘটেনি।

এই দীর্ঘ সময়ে সামান্যতম কোন বিরোধ বাধেনি। যে কোন ধর্মের উৎসবের দিনগুলোতে যোগ দেয় সবাই। মসজিদ ও মন্দির নির্মাণের প্রায় দুই শত বছরের ইতিহাসে দুই ধর্মের মধ্যে কোনো তিক্ততার ঘটনা নেই। এখানকার মানুষেরা আরো অনেক আগ থেকেই বিশ্বাস করে শন্তিপূর্ণভাবে যার যার ধর্ম পালনে।

স্থানীয় দেওয়ান আশফাক বলেন, “আমরা হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই। আমাদের মাঝে কোন ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই যার যার ধর্ম পালন করি। কেউ কাউকে কোন বাধা দেয় না”।

স্থানীয় কালাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মজুল জানান, এই মন্দিরের পাশেই একসময় বাজার গড়ে উঠে যা এখনো ভৈরব বাজার নামে পরিচিত। লোকমুখে প্রচলিত তথ্য মতে প্রায় দুইশত বছর পূর্বে পূণ্যদত্তের পরিবার এটি স্থাপন করেছিলেন ভৈরব মন্দিরের।

এর পর এখানে মসজিদ স্থাপন করা হয় ১৯৪৭ সালের দিকে। এলাকাবাসী ও মাজদিহি চা বাগানের কর্তৃপক্ষ নিজেদের অর্থায়নে মসজিদটি স্থাপতি করেন। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই দুই ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্মকর্ম পালন করে যাচ্ছেন।

মসিজিদের ইমাম মাওলানা জাফর আহমদ জানান, ১৫ বছর ধরে এখানে খতিবের দায়িত্ব পালন করছি, প্রায় ৭৩ বছরের ইতিহাস দুই ধর্মের মধ্যে কোন ত্যাক্ততার ঘটনা নেই। এই সময়ে কোনদিনও তাদের মধ্যে মনক্ষুন্নতা সৃষ্টি হওয়ার কোন ঘটনা ঘটেনি।

তিনি জানান, নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর প্রায়ই ভৈরব মন্দিরের পুরহিত জন্মজয় ভট্টাচার্য্যরে সাথে দেখা হয় তখন তারা সেখানে কুশল বিনিময় করেন।
এলাকাবাসী জামাল আহমদ বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই এভাবে দেখে আসছি নিজেও ৪০ বছর ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়ছি। আমরা বরং একে অপরের সমস্যায় এগিয়ে আসি। আমাদের কোন সমস্যা নেই ।

মন্দিরের পুরহিত জন্মজয় ভট্টাচার্য্য জানান, এখানে উভয় ধর্মের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের নিমন্ত্রণ দিলে তারাও আসেন অনুষ্ঠানে। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত মাঝে মাঝে কীর্তন করি শুধু নামাজের সময়ে আমাদের বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে রাখি যেনও তাদের সমস্যা না হয়। নির্দ্বিধায় তিনি বিগত ২৫/৩০ বছর ধরে এখানে পূজা পার্বণ করে আসছি।

শ্রীমঙ্গল ভৈরব বাজারের এই মন্দির ও মসজিদ বিশ্বের সাম্প্রদায়িক শক্তির জড়তা দূর করবে। এর চূড়া ও মিনারের সহাঅবস্থানের এই অনন্য দৃশ্যই প্রকৃত বাংলাদেশ এমনটাই মনে করেন অবিজ্ঞজনেরা।

শেয়ার করুন