৮ মার্চ ২০২০
সাইফা আলম সঞ্চি : দূরলোকের আলোকবর্তিকা, ক্ষণজন্মা সময়ের অনন্য উপমা, মমতাময়ী জননী, স্নেহময়ী মাতা, যে উপমাই হোক পরিচয় সে ‘নারী’। কত কথা, গল্প, যুদ্ধ, ধ্বংস, অতঃপর এক ইতিহাস এই নারীকে নিয়ে। নারীর সমঅধিকার আদায়ের আন্দোলনে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে ৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’।
নারী জাতির মুক্তি ও জাগরণের জন্য যুগে যুগে অনেক মহীয়সী নারী আন্দোলন, সংগ্রাম করে গেছেন। তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কুসংস্কারের বেড়াজাল পেরিয়ে কেউ কেউ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন পুরুষের পাশাপাশি সমমর্যাদায়। বাঁধন ছিঁড়তে সময় লেগেছে অনেক, সব বাধা অপসারিত হয়ে গেছে, তাও নয়। তাই নারী মুক্তির আন্দোলন এখনও চলছে।
সমাজ পুরোপুরি হয়নি কুসংস্কার মুক্ত, কাটেনি নারীর প্রতি পুরুষের বিদ্বেষ মনোভাব। লজ্জাজনক হলেও সত্য এখনো নারীরা নির্যাতন, হয়রানি, প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে, বাস করছে মানসিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।
আধুনিক যুগে বাস করে আজও নারীকে অবলা, অকেজো বিবেচনা করা হয়। এখনো পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারার দায় নারীকেই নিতে হয়। আমাদের সেকেলে ভ্রান্ত বিশ্বাস ‘ওই বংশে তো ছেলে নেই, বাতি জ্বালাবে কে?’ প্রচলিত ধারণা মতে ছেলে সন্তানই বংশের ধারক, বাহক কিংবা বংশের বাতি।
যুগ পাল্টেছে, পরিবর্তন হয়েছে মানুষের চিন্তা-চেতনার। বর্তমান প্রজন্মের সন্তান হিসেবে আমার দৃষ্টিতে সুসন্তানই পারে বংশের বাতি জ্বালাতে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা; যিনি শুধু তার বংশেরই নয়, বিশ্ব দরবারে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশকে। প্রবল মনের জোর, আত্মবিশ্বাস, মেধা-মনন দ্বারা একজন নারী যে দেশ নেতৃত্বের মত কঠিন দায়িত্ব পালন করতে পারেন; তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।
১৯৭৫ সালের সেই ভয়াল কালো রাতে পিতা-মাতা, স্বজন হারানো অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক আলোক নক্ষত্র ‘শেখ হাসিনা’। জীবনের নির্মম শোককে শক্তিতে পরিণত করে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন দেশ-মাতৃকার সেবায়। দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন পার করে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত জনগণের হৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লাগাতার সংগ্রাম করে চলছেন।
জীবনে এত চড়াই- উৎড়াই পার করলেও তার মধ্যে হতাশা ও সংগ্রাম বিমুখতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। সকল সংকট ও দুঃসময়ে তিনি দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে চলেছেন, নিজের অবস্থানে থেকেছেন অনড় ও অটল। অশুভশক্তির রক্ত চক্ষুর ভ্রুকুটি, নির্যাতন, হয়রানি, কারাভোগ, গৃহবন্দি, ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ একাধিকবার প্রাণনাশের অপচেষ্টা তোয়াক্কা না করে সাহসী পিতার সুযোগ্য উত্তরাধিকারের মতোই বলিষ্ঠতার সাথে বাংলাদেশের মানুষকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে লড়াই করে ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র , স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার অব্যহত সংগ্রাম জাতির সামনেই শুধু নয় বিশ্বের মানচিত্রে এক অনন্য দিক নির্দেশনা। একাত্তরের পরাজিত শক্তি কল্পনাও করেনি আবার ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থান ঘটবে, একাত্তরের চেতনার ধারক বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের। তারই সুযোগ্য সন্তানের দুঃসাহসিক নেতৃত্বে ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এক ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আজ দেশ। একটু পেছনে ফিরে তাকালে, সেই অটল সংগ্রামী দৃঢ়চিত্তের পরিচয় পেয়ে যাই।
সেই সঙ্গে দেখতে পাই আটপৌরে, ধর্মমনা, সারল্যময় জীবনযাপনের ষোলআনা বাঙালিয়ানা গুণে সমৃদ্ধ এক বাঙালি রমনীকে। জীবনের সবকিছু হারিয়ে এত দুঃখ, শোক আর দুর্যোগ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের একজন। তার সুমহান কর্মময়, সাফল্যময় জীবনদর্শন থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন সুসন্তানই পারে পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণ করতে।
আজ আমাদের দেশের নারীরা যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের সন্তান হিসেবে আমি বলব এর সিংহভাগ অবদান আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার। নারীর জাগরণ, ক্ষমতায়নের অনুপম অনন্য উপমা তিনি। নিপীড়িত, নির্যাতিত নারীর সামনে তিনি এক মহান উদাহরণ।
যিনি একাধারে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির কন্যা, স্বনামখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানীর স্ত্রী, সেই সঙ্গে সুযোগ্য সন্তানদের স্নেহময়ী মাতা। এতসব বিশেষণে বিশেষায়িত হয়েও তার নিজস্ব যোগ্যতায় নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাস হয়ে থাকবেন চিরকাল। আর এ নামটিই যুগ যুগ ধরে আমাদের মনে করিয়ে দেবে একজন যোগ্য কন্যা সন্তানও হতে পারে বংশের বাতি কিংবা বাতিঘরের আলোকবর্তিকা। জয় হোক এমন নেতৃত্বের, জয়তু ‘শেখ হাসিনা’।
(লেখক: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।)