১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : শীতের জীর্ণতা সরিয়ে এসেছে ঋতুরাজ। আজ পহেলা ফাল্গুন, জীবনকে রাঙিয়ে দেয়ার দিন। কবি শামসুর রহমান বসন্তের মায়ায় লিখেছেন, ‘গাছের শাখায় ফুল হাওয়ার সংস বে/যখন নীরবে দিব্যি সানন্দে দুলতে/ থাকে, পথচারী/ অথবা জানালা-ধরে-থাকা যুবতীর চোখ পড়ে/ কে জানে কী ছবি সব দোলে কিছুক্ষণ!/ বসন্তের মায়া রয়ে যায় বাস্তবিক নানাভাবে।’
সত্যিই বসন্ত ধরা দেয় নানাভাবে। ফুল ফোটার পুলকিত এই দিনে বন-বনান্তে, কাননে কাননে পারিজাতের রঙের কোলাহলে ভরে উঠছে চারদিক। এরমধ্যে এবার বসন্তের প্রথম দিন আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে, ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। তাইএবার বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবস ঘটা করে পালন করা হবে। আর এই দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে অপরূপ সাজে সেজেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শিমুল বাগান।
২০০৩ সালের দিকে ২ হাজার ৪০০ শতক জমিতে তিন হাজার শিমুল গাছ লাগানোর মাধ্যমে জয়নাল আবেদীন নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী এই বাগান শুরু করেন। শিমুল গাছের পাশাপাশি এই বাগানে অনেক লেবু গাছও রয়েছে। বসন্তকালে শিমুল বাগানের দিকে তাকালে গাছের ডালে ডালে লেগে থাকা লাল আগুনের ঝলখানি চোখে এসে লাগে।
শিমুল ফুলের রক্ত লাল পাপড়িগুলো এই সৌন্দর্য এখানে আসা সমস্ত মানুষের মনকেই রাঙিয়ে দেয়। এক দিকে মেঘালয়ের পাহাড় সারির অকৃত্রিম সৌন্দর্য অন্য দিকে রূপবতী যাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগানের তিন হাজার গাছে লাল ফুলের সমাহার শরীরে ভাল লাগার শিহরণ ধরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।
আর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পুরো এলাকাজুড়ে টকটকে লাল শিমুল ফুল দেখা যায়। পুরো এলাকায় যেন রক্তিম আভা। সব মিলেমিশে গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য কাব্য। লাল পাপড়ি মেলে থাকা রক্তিম আভায় যেন পর্যটকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ফাল্গুন আসার সাথে সাথে এখানে দেশ-বিদেশ থেকে আসতে শুরু করেন পর্যটকরা।
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হবার পরপরই পর্যটকরা ভিড় করতে শুরু করেন। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ঘুরতে যান। আর আজ দুই উৎসবকে ঘিরে পর্যটকদের ঢল নামবে শিমুল বাগানে। সেজন্য বাগান আর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি ।
এছাড়া সম্প্রতি ছোট পরিসরে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে শিমুল বাগানের ভেতরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ক্যাফেও তৈরি করা হয়েছে । যা তীব্র গরমে পর্যটক আর দর্শনার্থীদের পিপাসা নিবারণের মতই কাজে আসবে বলে অভিমত ঘুরতে আসা পর্যটকদের। এর নামকরণ করা হয়েছে শিমুল বাগান ক্যাফে, যার উদ্যোক্তা বাগানের মালিকপক্ষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুচারুভাবে সাজানো সারিবদ্ধ হাজারো শিমুল গাছের রক্তিম আভায় পুরো শিমুল বাগান যেন অপেক্ষমাণ বসন্তকে স্বাগত জানাতে। সেই সৌন্দর্য অবলোকন করতে গত ২-৩ ধরে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এছাড়া এখানে বেশ কিছু তরুণ-তরুণী ফুল দিয়ে বিভিন্ন ঘর বানিয়ে দেয়ার কাজ করছেন। এজন্য তারা কিছুটা পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন।
বাগানের প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল আবেদীনের ছেলে বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. রাখাব উদ্দিন বলেন, একজন আপাদমস্তক শিক্ষানুরাগী ও বৃক্ষ প্রেমী ছিলেন আমার বাবা। রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে হিজল করচ গাছ রোপণ, যাদুকাটা নদীতীরবর্তী শিমুল বাগান তৈরি করা, সোহালা সড়কের দুই পাশে কয়েকশত গাছ রোপণ ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাছ রোপণ করা- এসব কর্মকাণ্ড তাঁর বৃক্ষ প্রেমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হলে শিমুল বাগানসহ তাহিরপুরের অন্যান্য পর্যটন স্পটে আরো ব্যাপক পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে।
তাহিরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, আজ থেকেই দেশের বৃহত্তর শিমুল বাগানে বসন্ত উদযাপন করতে ছুটে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার দিকটি ভেবে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। যেন পর্যটক বা দর্শনার্থীরা অযাচিত কোন ঘটনার সম্মুখীন না হন। এ বিষয়ে প্রশাসন তৎপর থাকবে।