১৩ নভেম্বর ২০১৯


অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের যে ক্ষতি হয়

শেয়ার করুন

মো. বাকি বিল্লাহ : নেতৃত্ব শব্দটির অর্থ হলো পরিচালনা করা, পথ দেখানো বা অধিনায়কত্ব ইত্যাদি। সাধারণভাবে বলা যায় যে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তদারকি, পথ নির্দেশ ও যোগাযোগের মাধ্যমে সহযোগীদের থেকে কাজ বুঝে নেয়ার গুণকে নেতৃত্ব বলে। নেতৃত্বের সংজ্ঞায় হেমফিল ও কুনস বলেছেন, নেতৃত্ব হলো একজন ব্যক্তির আচরণ যখন তিনি একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি দলের কার্যাবলিকে পরিচালিত করে। আবার ফ্রড লুথান্সের মতে, নেতৃত্ব দানকারীর আচরণ অধীনস্থদের কার্যফল এবং সন্তুষ্টির উপর প্রভাব বিস্তার করে। এই দুটি সংজ্ঞায় প্রথমটিতে, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের এবং দ্বিতীয়টিতে, সহকর্মীদের সন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে। কার্যকরী নেতৃত্বের মধ্যে এই গুণ দুটি থাকা আবশ্যক। আর তা না হলে প্রতিষ্ঠান গতিহীন, অসংহত ও ফলাফল শূন্য হয়ে পড়বে।

অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্ব
একটি প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির বড় বাধা হলো অযোগ্য নেতৃত্ব। অযোগ্য ও অদক্ষ ড্রাইভার যেমন একটা গাড়িকে যথাযথভাবে গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে না, ঠিক তেমনি অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের গতিশীলতায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। পবিত্র হাদিস শরীফে আছে যে, “আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), কিভাবে আমানত বিনষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বলেছেন, যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করা হবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।”

উত্তম ব্যবহারের অনুপস্থিতি
অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্ব যে কোনো ক্ষেত্রেই উত্তম ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, এরা নিজেকে খুব বড় জ্ঞানী ও গুণ সম্পন্ন মনে করে। অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজেকে জাহির করে পুলকিত হয়। এতে প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠান। একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত সবার প্রচেষ্টার ফলে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়। অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্বের রূঢ় আচরণে সহকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন, এতে কাজের মানসিকতায় প্রভাব পড়ে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আর আল্লাহর রহমতের কারণেই তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছো। যদি তুমি কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতে তাহলে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা-আল ইমরান ৩/১৫৯)।

ফলাফল শূন্য কাজ
অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্বের ফলে প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাচার পরিবেশ তৈরি হয়। কোনো বৈঠক বা পরামর্শ ছাড়াই কাজ হয়ে থাকে। কেননা অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্ব কখনোই অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে না। নিজেকে সেরা মনে করেন। ফলে প্রতিষ্ঠান সুচিন্তিত ও যুক্তিপূর্ণ মতামত বঞ্চিত হয়। কাজের কোনো আউটপুট থাকে না। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা দেখা দেয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘আমি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) অপেক্ষা বেশি পরামর্শ করতেন।’

নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর অভাব
অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্বের ফলে প্রতিষ্ঠানে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর অভাব দেখা দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানের গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। কেননা অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্ব কর্মীদের ত্যাগ ও মেধা মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়। কর্মীদের যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব প্রদান না করলে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি থমকে যায়। যোগ্য কর্মীদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয় এবং অযোগ্য কর্মীদের মধ্যে অহংকারবোধ দেখা দেয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত সমূহ তার হক্বদারের উপর অর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন…’ (নিসা ৪/৫৮)।

যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থ
নিজের কাজ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্ব যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে না। এরা পুরানো ধ্যান-ধারণা, গতানুগতিক বা একঘেয়ে কাজে আবদ্ধ থাকে। ফলে কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকর্ষণ, আস্থা ও কাজে নিয়োজিত থাকার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হয়। এতে প্রতিষ্ঠান নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষমতার অপব্যবহার
অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্বের সর্বাপেক্ষা বড় ত্রুটি হলো এরা ক্ষমতার অপব্যবহারে পটু। বিভিন্ন ছলে তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে এবং নিজের কাজের ব্যাপারে উদাসীন। কিন্তু নেতৃত্বস্থানে থাকায় এরা নিজেদেরকে জাবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখতে নানা খলের আশ্রয় নেন। এতে প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, যে কোনো লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের বিকল্প নেই। যেমন স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ। কিন্তু যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা লাভ করা হয় তা টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন। ঠিক তেমনি একটা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সহজসাধ্য হলেও প্রতিষ্ঠানের স্বীয় লক্ষ্যে চলমান রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে হলে প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ ও অযোগ্য নেতৃত্বকে বাদ দেওয়াই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত।

শেয়ার করুন