৬ জুন ২০১৯


জীবন যেখানে যেমন

শেয়ার করুন

উপজেলা প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

মৌলভীবাজার : বিপন্ন জীবন সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে। হাসি-আনন্দ, সুখ-দুঃখ, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে-পরিবার; বাদ রাখেনি কিছুই। সর্বগ্রাসী দুর্ভাগ্য জীবনে সফলতার বদলে উপহার দিয়েছে কিছু বিষাদ, কিছু বেদনার হাহাকার। তবু থেমে থাকেনি জীবন, থেমে থাকেনি উঠে দাঁড়াবার পদক্ষেপ।

সবকিছু হারিয়ে সুদূর আমের শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চায়ের শহর শ্রীমঙ্গলে আসেন ভাগ্যাহত ইমরান। ভাগ্য তাকে তাড়িত করেছে বারবার। প্রায় দশ বছর ধরে শ্রীমঙ্গলে ফেরি করে বেড়ানো লোকটির মুখে এখন ফিরেছি কিছুটা স্বস্তির হাসি।

তার দ্বিচক্রযান অর্থাৎ বাইসাইকেলটি নানান ধরনের পণ্যে ঠাসা। স্বাভাবিকভাবে বাইসাইকেলটির উপরে উঠে চালানোর কোনো সুযোগ নেই। শুধু ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাওয়া ছাড়া। দীর্ঘ দ্বিচক্রযানের পথগুলো উপরে উঠে নয়; শুধুই ঠেলে ঠেলে চালানো হয়। কার্যসিদ্ধি বা কর্মকাণ্ডের সাথে মিলিয়ে নিলে নাম দাঁড়ায়: ঠেলা-বাইসাইকেল।

তার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন— ভাই, এখন আমার কথা বলার সময় নেই। তাড়াতাড়ি চা বাগানে পৌঁছাতে হবে। নয়তো শ্রমিকরা কাজে চলে গেলে আমার মালামালগুলো আর বেঁচতে পারবো। তিনি নিজ থেকেই হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘তাহলে হেঁটে হেঁটেই বলি?’দৈনিক ফেরি করে বেড়ান ইমরান | ছবি: বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপনএরপর বলে চলেন তার গল্প: “ভাই, নদীভাঙা মানুষ আমি। পদ্মা নদী আমার সব কেড়ে নিছে। জায়গা-জমি, ঘড়-বাড়ি সব। তারপর কাজের সন্ধানে সিলেটের দিকে চলে আসি। প্রায় দশ বছর ধরে শ্রীমঙ্গলে বাস করছি। তবে আমার পরিবার রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার তারাপুর গ্রামে। বছরে দুই ঈদে তাদের গিয়ে দেখে আসি।”

বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, “এক স্ত্রী আর ৫ জন ছাওয়াল আছে আমার। একটারে স্কুলে পড়তে দিয়েছি। হুনছি সরকার নাকি ফ্রি পড়ায়। তবে অন্য ছেলেরা কামকাজ করে খায়।”

ফেরি করে পণ্য বিক্রির কাজের আয়-রোজগার সম্পর্কে ইমরান বলেন, “আমার মালিকের সাথে শর্ত হলো সারাদিনে যা বিক্রি করবো তার শতকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আমার থাকবে। সে অনুযায়ী দৈনিক এক হাজার টাকার বিক্রিবাট্টা হলে নিজের দু-তিন শত টাকা থাকে। মাস শেষে সঞ্চয়ের অর্ধেক টাকা বউয়ের কাছে পাঠাই।”

ডান চোখটি আঘাতপ্রাপ্ত ইমরানের। সেই চোখে কম দেখেন তিনি। তারপরও ঠেলা-বাইসাইকেলে করে প্লাস্টিক আর স্টিলের বিভিন্ন পশরা নিয়ে পথে যেতে যেতে ইমরানের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। এই হাসি সর্বদাই থাকুক অমলিন।

শেয়ার করুন