২৪ আগস্ট ২০১৭


ঈদে ৫২ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারা

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক : বয়স সত্তুর পেরিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমানের। চার মেয়ের একজনকে বিয়ে দিয়েছেন, তিন জন কলেজে পড়ছে। অভাবের সংসার অনেক আগে থেকেই টেনেটুনে চলছে। মেয়েদের নতুন ড্রেস, জুতা কিংবা অলংকারের বায়না কখনোই সেভাবে মেটাতে পারেননি। তবে আসন্ন ঈদে তিনি মেয়েদের শখ পূরণ করবেন।

টাকা হাতে তুলে দিয়ে বলবেন- পছন্দমতো বাজার করতে। এবার ভাতা ও বোনাস মিলে তিনি যে সাড়ে ৫২ হাজার টাকার বান্ডিল পাচ্ছেন, তা মেয়েদের হাতে তুলে দেয়ার মাঝেই তাঁর সব আনন্দ। একথা বলতে গিয়ে চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি এই বীর সেনানী। এই জল আনন্দের, এই জল কৃতজ্ঞতার। আর এমন আনন্দ অশ্রু এখন দেশের অনেক গরীব মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারে।

কারণ ঈদের আগেই তিন মাসের ভাতা ও বোনাস মিলে সাড়ে ৫২ হাজার টাকা করে পাবেন, ভাতার জন্য তালিকাভূক্ত প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা। সিলেট জেলায় মোট ৪ হাজার ২শ ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা পাচ্ছেন এই টাকা। আগামী বুধ-বৃহস্পতিবারই তাঁরা টাকা পেয়ে যাওয়ার কথা। সিলেটে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাংক এ খাতের সর্বমোট ২২ কোটি ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৫শ টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদান করবে।

জিন্দাবাজারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা হয় কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে। এদের মধ্যে বিশ্বনাথের উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ওয়াহিদ আলী, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক কমান্ডার কুটি মিয়া ও দক্ষিণ সুরমার খালোমুখ ডুংশ্রী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান- কথা বললেন তাঁদের যুদ্ধে যাওয়া, স্বাধীনতার স্বপ্ন আর বর্তমানে প্রাপ্য সম্মান ও সম্মানী নিয়ে।

তাঁরা তিন জনই অভিন্ন কন্ঠে বললেন, ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান হিসেব করে আমরা যুদ্ধে যাইনি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাদুকরী ডাক আমাদেরকে ঘর থেকে টেনে বের করেছে। তখন তারুণ্য আমাদের শরীরে টগবগ করছিল। দেশের জন্য বন্দুক কাঁধে তুলে নিতে পিছপা হইনি। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। আমরা হয়তো ভাগ্যবান তাই বেঁচে গেছি, আমাদের সামনেই আমাদের কতো সহযোদ্ধা ভাই-বন্ধু প্রাণ দিয়েছে।

এই তিন মুক্তিযোদ্ধাই বললেন, বর্তমানে দেশের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে যে সম্মান দেয়া হচ্ছে- একসময় তা তাদের কল্পনায়ও ছিল না। এজন্য তারা বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ বলে জানান। তাঁরা বলেন, একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যার আন্তরিকতার কারণেই মুক্তিযোদ্ধারা আজ সম্মান ও সম্মানি দু’টিই পাচ্ছেন।

মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহিদ আলী বলেন, শেখ মুজিবের ভাষণ শুনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো যুদ্ধে গিয়েছিলাম। এখন তাঁর কন্যা আমাদেরকে সম্মানিত করছেন। আমরা আনন্দের সাথেই মরতে পারবো।

তিনি জানান, বিশ্বনাথে তার আরেক সহযোদ্ধা ছিলেন তালিবপুরের আব্দুল কাইয়ুম।

২০০৪ সালে স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে মারা যান আব্দুল কাইয়ুম। এরপর খুবই অভাব-অনটনে তাদের দিন কাটে। এখন সরকারের দেয়া ভাতায় তাদের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছে। এক মেয়ে কলেজে আরেক মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে।

মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান বললেন- একাত্তরে দেশের জন্য বন্দুক কাঁধে তুলেছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বন্দুক নামলেও কাঁধে চেপে বসে সংসার নামের বোঝা। দলিল লেখার অল্প আয়ে স্ত্রী আর চার মেয়ের সংসার চলছিল বেশ কষ্টে। এখন কষ্টের দিনগুলি দূরে সরছে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, তিন মেয়ে কলেজে পড়ছে। ঈদের আগে পাওয়া সাড়ে ৫২ হাজার থেকে একটি বড় অংশ তিনি মেয়েদের কেনাকাটা করতে দেবেন বলে জানান।

মুক্তিযোদ্ধা কুটি মিয়া বললেন- এখন যে সম্মান ও সম্মানি পাচ্ছি তার আনন্দ-কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমরা অভাবী মুক্তিযোদ্ধারা এজন্য শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়- ঈদের আগে সিলেট জেলার মোট ৪ হাজার ২শ ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা সাড়ে ৫২ হাজার টাকা করে পাবেন। এদের মধ্যে রয়েছেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২০৮ জন, সদর উপজেলার ২৯২ জন, দক্ষিণসুরমা উপজেলার ১৯৬ জন, বিশ^নাথ উপজেলার ১২১ জন, বালাগঞ্জ (ওসমানীনগরসহ) উপজেলার ১১৭ জন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ১১২ জন, গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৩৪৩ জন, বিয়ানীবাজার উপজেলার ৫২৪ জন, জকিগঞ্জ উপজেলার ২৭৫ জন, কানাইঘাট উপজেলার ২৭১ জন, জৈন্তাপুর উপজেলার ৪৫৯ জন, গোয়াইনঘাট উপজেলার ৭০১ জন ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৬২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। যে মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন তার স্ত্রী-সন্তানরা এই টাকা পাবে। ভাতা পাওয়ার জন্য যারা আগে থেকেই তালিকাভূক্ত, তারাই এই ভাতা- বোনাস পাচ্ছেন।

এব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট জেলার সভাপতি সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বলেন- অনেক অভাবী মুক্তিযোদ্ধার জীবনে এই প্রথম এমন আনন্দের দিন এসেছে। একসাথে বেশ কিছু টাকা পেয়ে তারা পরিবার নিয়ে খুশি মনে ঈদ উৎসব করবেন।

এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন- তাঁর আগ্রহ ও আন্তরিকতার কারণেই মুক্তিযোদ্ধারা আজ সম্মানিত হচ্ছেন। সিলেট বিভাগের প্রায় ২৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

 

 

(আজকের সিলেট/২৪ আগষ্ট/ডি/ইউপি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন