১৯ এপ্রিল ২০১৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেট : নগরীতে ছিন্নমূল পথশিশুরা মরণনেশা ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেই সময় তাঁরা রাস্তায় বসে নেশাতে বোঁদ হয়ে রইছে। পরিবেশ ও সমাজ এদেরকে দেখছে ভিন্ন চোখে। বঞ্চিত শৈশবে সাময়িক সুখের প্রত্যাশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে এসব শিশুরা। এসব মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধার করে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানাচ্ছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অপরদিকে শিশু আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন বিধায় জনসচেতনা বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
সিলেটে ড্যান্ডি নেশাতে আসক্ত হয়ে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে ছিন্নমূল পথশিশুরা। প্রায়ই দলবেঁধে সিলেট নগরের ক্বীন ব্রিজ, ফুটপাত ও রেলস্টেশন এলাকায় দেখা মেলে এসব পথশিশুদের। এদের বেশিরভাগই অভিভাবকহীন। এসব শিশুরা কখনো আবর্জনার স্তূপ থেকে প্লাষ্টিক, কাঁচের বোতল, লোহা থেকে মুরু করে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন জিনিস কুড়িয়ে বেড়ায়।
নেশার কবলে পড়ে এসব শিশু জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে। মাদক বহনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব শিশু। চুরি-ছিনতাইয়ের মত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে এসব শিশুরা।
সন্ধ্যা হতেই নগরের বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন কিংবা সুরমা নদীর তীরে দেখা মেলে অনেক পথশিশুদের। বসে বসে সেবন করছে ড্যান্ডি নামক এই নেশাদ্রব্য। জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে নেশা করে তারা। মাদক সেবনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনিরও ঘটনা ঘটছে।
সরেজমিন শহরতলীর দক্ষিণ সুরমার রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডগেরপাড়, নগরের ক্বীন ব্রিজের নিচ, কুশীঘাট, কাষ্টঘর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কিছু পথশিশু বসে ঝিমাচ্ছে আর পলিথিন দিয়ে কী যেন করছে। আবার কেউ কেউ পলিথিনে শ্বাস নিতে মগ্ন।
এটা কী জানতে চাইলে বলে, ‘ড্যান্ডি বানাইয়া খাই। এটি খাইলে মনের দুঃখ থাকে না, ক্ষুধাও লাগে না।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৩০ থেকে ৪০ টাকায় এক ধরনের জুতার গাম কিনে শিশুরা। নগরের প্রায় সব এলাকার দোকানেই এসব গাম পাওয়া যায়।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় কথা হয় দুই পথশিশুর সঙ্গে। তাদের একজন রুমন জানায়, তার মা-বাবার ঠিকানা সে জানে না। সে সারা দিন সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার এলাকায় আবর্জনা থেকে কাগজ ও প্লাস্টিক কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করে। এরপর বিকেলে রেলস্টেশন এলাকায় বসে ড্যান্ডি নিয়ে। যেদিন টাকা কম হয় সেদিন গাঁজা সেবন করে।
ক্বীন ব্রিজের নিচে কথা হয় ৯ বছরের শিশু কাদেরের সঙ্গে। সে বলে, আমার সঙ্গে থাকে রুমন, বাতিন, বিলাল। তারা সবাই আঠা (ড্যান্ডি) খায়, তাই ওদের দেখাদেখি আমিও আঠা খাই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ৮ থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুরা সাধারণত গাঁজা, সিগারেট ও গাম সেবন করে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সিরা ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-তরুণদের নেশার অন্যতম উপকরণ ইয়াবা। তবে অধিকাংশ পথশিশু ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত।
শিশু অধিকার আইনে এদের শাস্তির তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সহজেই এরা বিপথগামী হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এখনই এদের সুপথে ফিরিয়ে না আনলে বাড়বে অপরাধ। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমাজ ও দেশ।
সিলেট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা জানান, জুতার আঠা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু নয়। এ কারণে এ বিষয়ে কিছু করতেও পারছি না। সিলেটের অনেক পথশিশু এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। গাম যেহেতু প্রয়োজনীয় দ্রব্য তাই বিক্রি বন্ধ করা যাবে না।
তবে আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি যারা বিক্রি করেন তাঁরা একটু সচেতন হলেই এই নেশা থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব।’
সিলেটে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠন ইচ্ছাপূরণ এর সভাপতি জান্নাতুল রেশমা রুমা বলেন, ‘পথশিশু সমাজের একটি অভিশপ্ত নাম। সমাজ এবং পরিবারের অবহেলার জন্য একটি নিষ্পাপ বাচ্চা সমাজে পথশিশু নামে পরিচিতি পায়। সমাজের সু-দৃষ্টি এবং সচেতনতাই পারে এসব বিপথগামী শিশুদের ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরুর পর থেকেই দেখেছি তারা বিভিন্ন নেশায় আসক্ত। তাদের অধিকাংশই ড্যান্ডি নেশাতে আসক্ত। নগরের বিভিন্ন এলাকায় ড্যান্ডি নেশায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী এসব মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধারের ওপর জোর দেওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদফতর, পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এসব শিশুদের উদ্ধার করে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্যথায় দেশ ও সমাজ ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে।’
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. জেদান আল মুসা বলেন,‘ শিশু অধিকার আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই কঠিন। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদফতর এসব মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধার করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়োজনে পুলিশ সমাজসেবা অধিদফতরকে সহায়তা করবে। এসব মাদকাসক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না হলে এরা বিপথগামী হয়ে পড়বে। এরা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সমাজ অন্ধকারের পথে চলে যাবে। কাজেই এদের রক্ষার্থে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।’