২৩ আগস্ট ২০১৭


কবে চালু হবে ‘লাতুর ট্রেন’?

শেয়ার করুন

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাতুর ট্রেন চালু হবে তো! আবার ঘুম ভাঙাবে কী ‘লাতুর ট্রেন’ ? এ কথা প্রায়ই মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে।

২০০২ সালে কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনে রেল চলাচল বন্ধ হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় রেললাইনটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শুরু হয়নি কাজ। সর্বশেষ ২০১৫ সালে একনেকের বৈঠকে ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা অনুমোদন পায়। এ খবরে বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ১০ লক্ষাধিক মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জাগে। কিন্তু একনেকে বিল পাস হওয়ার প্রায় ২ বছর অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি এ রেললাইনটির সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। এতে চার উপজেলার ১০ লক্ষাধিক মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছেন।

এদিকে সংস্কারের অভাবে রেললাইনের ছয়টি স্টেশনের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রভাবশালীরা নানাভাবে দখল করে নিয়েছেন রেলওয়ের জায়গা। বেহাত হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

এ সেকশনে ট্রেনটি চলাচল শুরু সরকার রেলওয়ের বেহাত হওয়া কোটি কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার করার পাশাপাশি সচল হবে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর রেলষ্টেশন। এছাড়া ১৮টি চা বাগানসহ বৃহত্তর বড়লেখা-জুড়ী-কুলাউড়া ও সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি পণ্য আমদানি ও যাতায়াতের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

স্থানীয় লোকজন ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০০২ সালের ৭ জুলাই মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইনটি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। রেললাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৎকালীন সময়ে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া এবং সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ছয় থেকে সাত লাখ মানুষ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণে সমস্যায় পড়েন। সড়কপথে ভাড়া বেশি হওয়ায় এলাকাবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।

জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর এই ছয়টি রেলস্টেশন স্থবির হয়ে পড়ে। ট্রেন চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময়ে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার মানুষ সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সভা সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ) অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ী হলে কুলাউড়া-শাহবাজপুর ট্রেনলাইন চালু করবেন। নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন। এরপর ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক বৈঠকে বাংলাদেশ রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্প পাস হয়। এই প্রকল্পে রেললাইন পুননির্মাণ, রেল স্টেশনের ভবন সংস্কার, সংকেত-ব্যবস্থার উন্নতিসহ ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ১১৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এটির পুনর্বাসন কাজ শেষ করার কথা থাকলে এ প্রকল্পটিও আর আলোর মুখ দেখেনি।

২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বড়লেখা সফরকালে বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য মো. শাহাব উদ্দিন রেললাইন চালুর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে রেললাইন চালুর ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটির আওতায় কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনে (পুনর্বাসন প্রকল্প সংশোধিত) ফের ট্রেন চালুর লক্ষ্যে মে মাসের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে লক্ষ্যে ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়া হয়। ওই বছরের ৭ জুন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে এ প্রকল্পেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুলাউড়া-শাহবাজপুর ব্রডগেজ রেললাইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রায় এক বৎসর পর ২০১৬ সালের ২৭ জুন ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা কুলাউড়া জংশনে এসে কুলাউড়া শাহবাজপুর রেললাইন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।

এরপর একাধিকবার রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও পুরো রেললাইন এলাকা জরিপ করে গেছে। এ সময় তাঁরা রেললাইনের সেতু, স্লিপার, প্ল্যাটফরম, স্টেশন ভবন, কর্মচারীসহ কোথায় কী লাগবে, তার তথ্যও সংগ্রহ করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ রেললাইনটির সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। এর ফলে বড়লেখা-জুড়ী-কুলাউড়া ও সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ১০ লক্ষাধিক মানুষের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত আসাম-বেঙ্গল (এবি) রেলওয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়। এরপর ট্রেন চলাচল কুলাউড়া-শাহবাজপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এলাকাবাসীর কাছে ‘লাতুর ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল।

এ ব্যাপারে রেলওয়ের কুলাউড়া জংশনের উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) আরফানুর রহমান বলেন, ‘ট্রেনলাইন চালুর প্রক্রিয়া চলছে। শীঘ্রই কাজ শুরু হবে।’

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, ‘রেললাইন চালুর অগ্রগতির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। জুন মাসে টেন্ডার ওপেন হয়েছে। শীঘ্রই কাজ শুরু হবে।’

এ রেলপথটি চালু হলে জ্বলে উঠবে সিগনাল। সচল হবে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর রেল স্টেশন। আবারও ঘুম ভাঙবে ‘লাতুর ট্রেন’ বড়লেখা-জুড়ী-কুলাউড়া ও সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসীর। মানুষ চান-এসব স্টেশন আবার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠুক। নতুন করে চালু হোক বন্ধ হওয়া লাতুর ট্রেন।

 

(আজকের সিলেট/২৩ আগষ্ট/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন