১৮ জানুয়ারি ২০১৯


তবুও নগরীর সড়কে নেই ‘শৃঙ্খলা’

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : আধ্যাতিক রাজধানীর সড়কে বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছেনা ট্রাফিক পুলিশ। একের পর এক ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণেও চালকদের কাছ থেকে খুব বেশি সাড়া পাচ্ছেন না তারা।

যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্বের চেয়ে সড়কে আইন মেনে চলার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। যদিও এখনও মুখ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। আর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের দৃঢ় পদক্ষেপই সড়কে শৃঙ্খলে ফিরিয়ে আনতে পারে। যদিও এইক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন বলে অভিযোগ তাদের।

গেল বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সারা দেশেই সড়কে শৃঙ্খলা মানার প্রবণতা বেড়েছিল। সিলেটেও চালকদের ট্রাফিক আইন মানার দৃশ্য বেশ লক্ষনীয় ছিল। আন্দোলনের পরপরই শুরু হয় ট্রাফিক সপ্তাহ। তখনও পুলিশের বাড়তি তৎপরতায় সড়কে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। কিন্তু ট্রাফিক সপ্তাহের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর সড়কে আবারও বিশৃঙ্খলা ফিরেছে। যদিও বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে চালকদের সচেতনা করতে দিনভর মাইকিং কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

সিলেট নগরের বেশ কয়েকটি সড়ক ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি সড়কে গড়ে উঠেছে যানবাহন স্ট্যান্ড। সেখানে উভয় দিকের সড়কে পার্কিং করে রাখা হয়েছে অন্তত ২০টি যানবাহন। পার্কিং এর কারণে ওইসব এলাকার সড়কের একাংশও সরু হয়ে আসে। ফলে ওইসব সড়ক দিয়ে বড় একটি যানবাহন চলাচল করার মত জায়গা থাকে।

সড়কে যানজট সৃষ্টি হলেই মোটরসাইকেল আরোহীরা ফুটপাতের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যান। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও ট্রাফিক সপ্তাহের পুলিশের তৎপরতায় মোটরসাইকেল আরোহীদের মাথায় হেলমেট পড়ার প্রবণতা আগের থেকে বেড়েছে। তবে এখনও অনেকের সঙ্গে হেলমেট থাকলেও সেটি মাথায় না পড়ে বাইকের হাতলে রাখার অভ্যাসও রয়ে গেছে।

এছাড়াও সড়কের পাশে রিক্সার জটলা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সড়কে লাইন না মেনে এলোপাথারি গাড়ি চলাচল, যত্রতত্র পাকিংসহ আরও বিভিন্ন ধরণের বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ে। তবে নগরের চৌহাট্টায় সড়কে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান আগের মতো সড়কে এখন কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর থেকে অনেক চালকই গাড়ি নিয়ে বের হন না বলেও জানান।

সহমত থাকলেও মানতে অনীহা
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সড়কে এক লাইনে গাড়ি চলাচলের দৃশ্য দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা যানবাহনের গতিরোধ করে বৈধ কাগজপত্র যাচাই করতে দেখা যায়। যাদের হেলমেট নেই তাঁদেরকে হেলমেট পড়ার পরামর্শ দেয় শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে সড়কে চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার একটি প্রবণতা দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের এই দেখিয়ে দেওয়াকে চালকরা মেনে নিলেও অনীহা থাকার কারণে তা মানছেন না চালকরা। তাঁদের এই কাজকে সহমত জানালেও অভ্যস্ত না থাকার কারণেই আইন মানা হচ্ছে না এমনটা বলছেন অনেকেই।
বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থী মুন্না আহমেদ বলেন, ‘সড়কে গাড়ি নিয়ে চলাচলের সময় ট্রাফিক আইন মানা উচিত। কিন্তু অনেক সময় ব্যস্ততা থাকার কারণে দ্রæত পৌঁছার তাগিদে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেণ। তবে এটি কোনো ভাবেই কাম্য নয়। শৃঙ্খলা ফিরাতে সকলকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে।’

যত্রতত্র পার্কিংয়ে বাড়ছে জটলা
সিলেট নগরে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে সড়কের বিশৃঙ্খলা আরও বেশি বাড়ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে রিক্সার জটলাই বেশি চোখে পড়ে। এদিকে নগরের বেশির ভাগ বিপনীবিতানের পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতাদের গাড়ি অন্য জায়গায় পার্কিং করতে রাখতে হয়। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় ট্রাফিক পুলিশদের।
তবে নগরের মধ্যে তিন-চার তলা বিশিষ্ট আলাদা পার্কিং ব্যবস্থা তৈরী করলে সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে বলে মনে করেন নাগরিক সংগঠন সংক্ষুব্দ নাগরিক কমিটির সংগঠক আবদুল করিম কিম। তার মতে পার্কিং ব্যবস্থা তৈরি করলে সেখানে সিএনজি মোটর সাইকেল গাড়ি আলাদা করে রাখতে পারলে সমস্যা অনেকটা কমে আসবে। পুলিশেরও উচিত যত্রতত্র পার্কিং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আইন সবার জন্য সমান এমন একটি প্রথা চালু করতে হবে। অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তারাও ওয়ান ওয়ে রোডের বিপরীতে গাড়ি চালিয়ে চান।

গাড়িরর স্ট্যান্ডে সড়কে প্রভাব
আম্বরখানা, চৌহাট্টা, বন্দরবাজার ও রিকাবীবাজার সড়ক নগরে গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়ক দিয়ে মানুষ ও গাড়ি চলাচলের পরিমান বেশি। তবে এই সড়কগুলোতে গড়ে উঠেছে যানবাহনের স্ট্যান্ড। সড়কের অনেকাংশজুড়ে স্ট্যান্ডের যানবাহন পার্কিং করে রাখা হয়। পার্কিং এর কারণে সড়ক ছোট হয়ে যায় গাড়ির জটলা বৃদ্ধি পেয়েছে। যানজটের পরিমানও বেড়েছে।

পথচারী আবুল কাশেম বলেন, ‘গাড়ির স্ট্যান্ড এর কারণে সড়কের পরিধি ছোট হয়ে গেছে। যানজট লাগলে পার্কিং করা এসব গাড়ির কারণে পথচারীদের চলাচলেও বেগ পোহাতে হয়।’

তবে গাড়ির স্ট্যান্ডের কারণে সড়কে শৃঙ্খলায় কোনো প্রভাব পড়ছে না জানিয়ে সিলেট জেলা পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক বলেন, ‘স্ট্যান্ড থাকার কারণে নগরবাসী সেখান থেকে যানবাহন ভাড়া করার সুবিধা পাচ্ছেন। এর কারণে সড়কে কোনো ধরনের প্রভাব পড়ছে না।’

সচেতনা বৃদ্ধিতে পুলিশের দিনভর মাইকিং
পুলিশ বলছে, সড়কে চালকদের আইন মানার প্রবণতা তেমন বাড়েনি। তবে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর পুলিশের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সিলেটে কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে। চালকদের সচেতনতার বিষয়টি বার বার বলা হলে একসময় ঠিকই তারা আইন মেনে চলবে।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) নিকুলীন চাকমার মতে, ট্রাফিক পুলিশের সচেতনতামূলক পদক্ষেপের কারণে চালকদের এখন হেলমেট পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার কোনো মুখ্য পরিবর্তন হয়নি।

নিকুলীন চাকমা বলেন, ‘চালকদের সচেতন করতে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে বারবার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে সারাদিন মাইকিং কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই চালকরা আগে নিজেরা আইন মানবেন পরে অন্যকে আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করবেন। আমরা আশা করি একটা সময় সফল হব।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতি শনিবারের ট্রাফিক ক্যাম্পেইন কর্মসূচি বিভিন্ন কারণে আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। এটা আবারও শুরু করা হবে। এখন সড়কে হেলমেট পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। আমরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগ করছি।’

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি সজাগ হতে হবে বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, চালকরা পুলিশকে ম্যানেজ করেই সড়কে বিশৃঙ্খলা করছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের আরও দৃঢ় পদক্ষেপই পারে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। এক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনরাও মুখ্য একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদেরও উচিত জোরালেভাবে পদক্ষেপ নেওয়া। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই পারবে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে একটি সুশৃঙ্খল সড়ক উপহার দিতে।’

শেয়ার করুন