১৫ আগস্ট ২০১৭
আব্দুল কাদের তাপাদার : একে একে পেরিয়ে এলাম জীবনের অনেকগুলো বছর। পেছনে ফিরে তাঁকালে সেই স্বর্নালী সময়গুলো চোখের দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়। যে সময়ের সিংহভাগ জুড়ে আছে আমার লেখালেখি আর সাংবাদিকতা জীবনের দিনগুলো।জীবন নদীর আজকের এই সীমায় এসে দাঁড়ালে মনের ভেতর থেকে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে ফিরে আসে। এই সাংবাদিকতা থেকে কি পেলাম, কি করলাম বা কি দিয়ে গেলাম। সেই বিবেচনা সময়ের কাছে ছেড়ে দিলাম। ডায়েরীর পাতার মতো আমার সাংবাদিকতা জীবনের কিছু কথা নিয়ে আজ পাঠকের সামনে হাজির হলাম। মনে করলাম নিজের জন্য না হোক অন্তত উত্তর প্রজন্মের জন্য এই লেখা থেকে যদি কিছু নেবার থাকে তাহলে তাদের কেনো বঞ্চিত করবো।
বড়লেখা, ১৯৮৩।সাংবাদিকতা শুরুর গল্প। আমাদের বাড়ি থেকে সবুজের গালিচা বিছানো মেঠোপথ মাড়িয়ে ১৫ মিনিট জোরকদমে হাঁটা দিলেই বড়লেখা রেলস্টেশন। দিবানিশি কোলাহলমুখর রেলওয়ে মার্কেট। সি এন্ড বি সড়ক ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রাচীন হাজিগঞ্জ বাজার।
বাজারের ঠিক দক্ষিণ মাথায় বড়লেখাবাসীর প্রিয় শিক্ষায়তন আমাদের পি সি উচ্চ বিদ্যালয়। আমি এই স্কুলের ছোটো ক্লাসের খুব সুপরিচিত এক ছাত্র। সেকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমাদ্রিত দৈনিক ইত্তেফাক এ এই স্কুলের সমস্যা নিয়ে আমার একটা লেখা ছাপা হওয়ার কারণে রীতিমত হৈচৈ পড়ে গেছে।
এর কিছুদিন আগে বশির স্যারের সম্পাদনায় স্কুলের দেয়ালিকায় আমার বর্ষা নামক কবিতা নিয়ে তুমুল হৈচৈ।এতো সুন্দর কবিতা কি আমার লিখা? কি করে আমি এটা লিখতে পারি!! এতো কম বয়সে আমি এতো ভালো মানের কবিতা লিখলাম কি করে?
যাক শেষ পর্যন্ত আমার কয়েকজন শিক্ষক বিশেষ করে আমার পাশের বাড়ির পিতৃতুল্য বড় ভাই ও স্কুলের খুবই প্রভাবশালী,মেধাবী ও জনপ্রিয় শিক্ষক ছয়েফ উদ্দীন স্যার (যিনি পরে প্রধান শিক্ষক হন,আমার অভিভাবক স্যার এখন আর বেঁচে নেই) দায়িত্ব নিয়ে বললেন এটা আমারই লেখা।আমার এ ধরনের লেখার মতো মেধা রয়েছে বলে তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করলেন।
তখন বড়লেখা বাজারে ৩ টি জাতীয় দৈনিক পাওয়া যেতো। ইত্তেফাক, দেশ আর সংগ্রাম। এজেন্ট ছিলেন তালিমপুরের জইন উদ্দিন ভাই আর দিশারী লাইব্রেরী। আমি ৩ টি পত্রিকারই মোহমুগ্ধ পাঠক। স্কুল ছুটির পর আমার বাড়ি ফেরার আগে এগুলো পড়া চাই, চাই ই। কোনোদিন বেশী দেরীতে ছুটি হলে দৌড়ে বাড়ি এসে মুখে চারটা ভাত দিয়ে আবার একদৌড়ে বাজারে।
অনেকে উৎসাহ দিতেন আবার কেউ কেউ খারাপ চোখে দেখতেন।এতোটুকুন বাচ্চা কিশোর ছেলের পত্রিকা নিয়ে মাতামাতি ভালো লাগতো না কারো কারো। বাজারে বিনে পয়সায় পত্রিকা পাঠের জায়গা ছিলো দুটো।দিশারী লাইব্রেরী আর বজলু ভাইয়ের ( বজলু আর্ট,বাড়ি পাখিয়ালা) দোকান।
তখনকার দৈনিক ইত্তেফাক আমায় খুব টানতো।দারুন। মোহমুগ্ধের মতো। কোনো দিন ইত্তেফাক না পড়লে রাতে ঘুম হতো না।ইত্তেফাকের প্রথম পাতার নিউজ ৩ নং পাতার আন্তর্জাতিক সংবাদ আর ভেতরের মফস্বল পাতা আমাকে আকর্ষণ করতো বেশী।
সংবাদপত্র পড়তে পড়তে আমার কেনো জানি সাংবাদিক হওয়ার মনোবাসনা ও আগ্রহ দিন দিন প্রবল হতে থাকলো। কিন্তু কাকে বলি মনের এ কথা? কে পারবে এটা পূরণ করতে? (চলবে)
(লেখক : সাংবাদিক এবং কবি। নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ।)