২০ জানুয়ারি ২০১৯
শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : হাওড় অধ্যুষিত প্রত্যন্ত উপজেলা শাল্লা। এই উপজেলায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। বর্ষায় চারিদিকে থৈ থৈ পানি। হেমন্তে চারিদিকে সবুজ ঘেরা মাঠ। স্বাধীনতার ৪৮বছর পরও বদলে যায়নি মান্দাত আমলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দুরে এর অবস্থান। প্রাচীনকালের আদিম মানুষের মত বসবাস করতে হচ্ছে ভাটির এই মানুষেরা। বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে রুপ বদল হয়নি জেলার এই একমাত্র উপজেলার।
তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও আশ্বাস আর প্রতিশ্র“তির মধ্য দিয়ে বন্দী করে রেখেছে উন্নয়নের চিত্র। দিরাই শাল্লা দুই উপজেলা নিয়ে সংসদীয় আসন সুনামগঞ্জ-২। এই আসন থেকে বার বার নির্বাচিত হয়েছেন প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। উনি সাংসদ থাকাবস্থায়ও এলাকার উন্নয়নে কোনো স্থির চিত্র স্থাপন করতে পারেন নি।
তবে উনার মাধ্যমেই দিরাই শাল্লা আঞ্চলিক সড়কের নির্মাণ কাজের অনুমোদন পায়। উনি জীবিত থাকাবস্থায় হাওড়ের মধ্যে দিয়ে দিরাই শাল্লা সড়কের মাটি ভরাট কাজ শুরু হয়। শুরুতে কাজের অগ্রগতি দেখে সাধারণ জনগন মনে করেছিলেন কল্পনা বাস্তবায়ন হতে চলছে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়ও ছিল দিরাই শাল্লা আঞ্চলিক সড়কের রুপকার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কিন্তু সেই আশা আর পুরণ হলনা। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। উনার মৃত্যুর পরপরই দিরাই শাল্লা সড়কের নির্মাণ কাজে ধীরগতি চলে আসে। এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় সড়কের মাটি ভরাট কাজ। দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক সড়কের নির্মাণ কাজ প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ৮ বছর আগে নির্মাণ কাজ শুরু করে এখনো মাটির কাজ শেষ হয়নি। বর্ষায় রাস্তার দুপাশ ঢেউয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে। এছাড়াও সড়কের ৩টি স্থানে ভেঙ্গে বড় বড় খালের সৃষ্টি হয়েছে। শাল্লা উপজেলায় সড়কের কাজ যেমন ঝুলে আছে তেমনি ঝুলে আছে বিদ্যুতের খুটি ও তার। দৃই বছর আগে উপজেলার আনন্দপুর, নিয়ামতপুর, রামপুর, কাশিপুর ও হবিবপুরসহ অন্যান্য গ্রামে বিদ্যুতের খুটি ও তার টানা হলেও এখনো পর্যন্ত আলো জ্বলেনি। যার ফলে স্থানীয় লোকজনের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সুত্রে জানা
গেছে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় দিরাই শাল্লা সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। নতুন করে স্টাডির পর আবারো প্রকল্প নেয়া হবে। আরো জানা যায়, ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। দিরাই থেকে শাল্লা উপজেলা সদর ঘুঙ্গিয়ারগাও পর্যন্ত ৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯১ কোটি টাকা। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি থাকায় ব্যাহত হয় সড়ক নির্মাণ কাজ। এ জন্যে কেবল শুকনো মৌসুমেই সড়কের বেশির ভাগ কাজ করা হয়।
সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে ২০১০ সালের পর থেকে সড়কটিতে প্রায় ৯০ ভাগ মাটির কাজ সম্পন্ন হয়। দিরাই পৌর শহরের রাধানগর থেকে ঘুঙ্গিয়ারগাঁও পর্যন্ত ৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির চন্ডিপুর,কাশিপুর ভোলানগর, সুখলাইন এলাকায় ঢেউয়ে ভেঙ্গে বড় বড় খালের সৃষ্টি হয়েছে। পরে প্রকল্পের মেয়াদ না থাকায় গত মৌসুমে হাওররক্ষা বাঁধ হিসেবে চিহ্নিত করে, কাশিপুর, মাউচ্ছকাড়া, গেলটিয়া ও সুখলাইন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ভাঙ্গা স্থানে মাটি ভরাট করা হয়।
এছাড়াও সড়কের অসংখ্য স্থানে দু’পার্শ্ব থেকে পানির ঢেউয়ে মাটি সরে গেছে। সড়কটির নোয়াগাঁও, সুখলাইন, আনন্দপুর মাদারিয়া ও ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সদরে দাড়াইন নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সংযোগ সড়ক না থাকায় কোনো সেতুই ব্যবহৃত হচ্ছে না। এলাকাবাসী বাঁশের মাচা তৈরি করে দাড়াইন নদীর উপর তৈরি সেতু দিয়ে লোকজন কোনো মতে যাতায়াত করছেন।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের দাবি ৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১০ কিলোমিটার পাকাকরণ করা হয়েছে। মাটির কাজ করা হলেও প্রবল ঢেউয়ে অনেক জায়গার মাটি সরে গেছে। এ অবস্থায় ২০১৭ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে প্রকল্পটির মেয়াদ বর্ধিত করণের
জন্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয় সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। কিন্তু মন্ত্রণালয় এই পত্র আমলে না নিয়ে নতুন করে প্রকল্প গ্রহণের জন্যে বলা হয়। এর পর সড়কটিতে কোনো কাজ হয়নি। চলতি শুকনো মৌসুমেও সড়ক নিয়ে সড়ক বিভাগের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
স্থানীয় লোকজন জানান, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের স্বপ্নের সড়ক ছিল দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক সড়ক। দিরাই, শাল্লা ও হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই উদ্যোগ নেয়া হয়। উনার মৃত্যুও পর এই আসনে সাংসদ হন উনার সহধর্মীনি জয়া সেন গুপ্তা। উনিও শাল্লাবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন সুরঞ্জিত সেনের অসমাপ্ত কাজ কাজ সমাপ্ত করবেন।
তবে আজও পর্যন্ত কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি শাল্লায় কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুতের খুটি ও লাইন টেনে স্থগিত কওে রেখেছেন। উদ্বোধনের কোনো খবর নেই। স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন খুটি আর লাইন দেখিয়ে ভোট হাসিল করার পায়তারা চলছে। আনন্দপুর গ্রামের হররঞ্জন রায় জানান, কাজের নামে দেখা নেই, ভোটের জন্য দোয়ারে। এমন প্রার্থীকে আমরা ভোট দেব না। যে প্রার্থী জনগনের উন্নয়নে কাজ করবে আমরা সেই প্রার্থীকেই ভোট দেব।
ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজার ব্যবসায়ী নিখিল রায় জানান, দিরাই-শাল্লা সড়ক নির্মাণ কাজ শুরুর পর আমাদের মাঝে আশার আলো সঞ্চার হয়েছিল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্বপ্নের সড়ক ছিল এটি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুনছি প্রকল্পের মেয়াদই নেই। আমরা হতাশ হয়েছি। জনগণের মাঝে এনিয়ে ক্ষোভও আছে।
সুনামগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির কাজ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়। এ পর্যন্ত ৯১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সকল প্রক্রিয়া শেষে আবারো দিরাই শাল্লা আঞ্চলিক সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।