৮ অক্টোবর ২০১৮


হবিগঞ্জ ১ : গৃহদাহে জ্বলছে আওয়ামীলীগ, স্বস্থিতে বিএনপি-জাপা

শেয়ার করুন

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : হাওর-বাওর আর পাহাড়-সমতলে ঘেরা জনপদের নাম হবিগঞ্জের ‘বাহুবল-নবীগঞ্জ’। ২০টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এলাকাটি হবিগঞ্জ-১ আসন হিসেবে পরিচিত। বিপুল সংখ্যক প্রবাসি ও চা শ্রমিক অধ্যুষিত এ এলাকায় রয়েছে ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৭ জন ভোটার। এর মধ্যে নবীগঞ্জে রয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪০ জন ভোটার ও বাহুবল উপজেলায় রয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৭ জন ভোটার।

১৯৯৬ সাল থেকে এ আসনটি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের শক্ত ঘাটি হিসেবে পরিচিত। তবে এক সময় এটি ছিল জাতীয় পার্টিরও দূর্গ। কিন্ত পরবর্তীতে সময়ের ব্যবধানে ভোটের অংকে জাতীয় পার্টিকে টপকিয়ে এগিয়ে যায় আওয়ামীলীগ ও বিএনপি। যদিও এ এলাকায় সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজো্েটর মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্ধন্দিতায় নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। বর্তমানে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষে চলছে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা।

একদিকে, আওয়ামীলীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চাচ্ছেন আসনটি যেন আবারও হাত ছাড়া না হয়। অপরদিকে, জাতীয় পার্টি চাচ্ছে ধরে রাখতে। আর বিএনপিও চায় বাজিমাত। এটি ভোটের অংকে শক্তঘাটি হিসেবে পরিচিত হলেও চতুর্মুখী গৃহদাহে জ্বলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠ-ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য ৪ প্রার্থী। পৃথক ভাবে চলছে তাদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা।

এরা হলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী কন্যা হবিগঞ্জ-সিলেট সংরক্ষিত আসনের বর্তমান নারী সংসদ এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডাঃ মুশফিক হোসেন চৌধুরী, আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিক প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী পুত্র শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী এবং জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি, নবীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী

এদিক দিয়ে কিছুটা হলেও ঝামেলা মুক্ত বিএনপি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহন করলে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাবেক এমপি শেখ সুজাতের হাতেই যেতে পারে ধানের টিকিট। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বছরের অধিকাংশ সময় প্রবাসে অবস্থান করেন। যে কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করে আসছে। এ আসনে আরেক প্রবাসি বিএনপি নেতা শাহ মোজাম্মেল হক নান্টুও মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার। একই অবস্থা জাতীয় পার্টিতেও।

মহাজোটের কল্যাণে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় নির্বাচিত জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য এম এ মুনিম চৌধুরী বাবুই হতে পারেন দলীয় প্রার্থী। তবে প্রবাসি জাপা নেতা আব্দুল হামিদও জোর লবিং চালাচ্ছেন মনোনয়নের জন্য। যদিও তিনি বছরের অধিকাংশ সময় প্রবাসে অবস্থান করেন। এ আসনে জামায়াত বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তেমন কোন নির্বাচনী তৎপরতা নেই।

তবে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক খেলাফত মজলিসও জোটের মনোনয়ন চাচ্ছে এখানে। দলটির জেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম জাকীও আছেন নির্বাচনী মাঠে। এছাড়াও স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রবাসী কমিউনিটি নেতা শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ।

জানা যায়, এ আসনে ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির নেতা খলিলুর রহমান চৌধুরী রফি, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৯ সালে হ্যাট্রিক বিজয় পান বর্ষীয়ান আওয়ামীলীগ নেতা প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী। তার মৃত্যুর পর ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে বাজিমাত করে বিএনপি। দলীয় কোন্দলসহ নানা কারণে আওয়ামীলগ প্রার্থী ডাঃ মুশফিক হোসেন চৌধুরীকে মাত্র ১২শত ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া।

এরপর ২০১৪ সালের অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টি কে আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামীলীগ। যে কারণে বিনা প্রতিদ্ধন্দিতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মুনিম চৌধুরী বাবু।

জানতে চাইলে নিজের প্রার্থীতার বিষয়ে হবিগঞ্জ-সিলেট সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মোতাবেক সাধারণ মানুষের কল্যাণে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। বিশেষ করে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, অবহেলিত গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতায়ন ও চা শ্রমিকসহ সুবিধা বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমার পরিশ্রম ও সাধারণ মানুষের ভালবাসার মুল্যায়ন করবেন নেত্রী। আমি আশাবাদি মনোনয়ন পেলে নৌকার বিপুল বিজয়ে পুনরুদ্ধার হবে আসনটি।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য মুনিম চৌধুরী বাবু বলেন, স্বাধীনতার বয়স ৪৭ পেরিয়ে গেছে। এই ৪৭ বছরের মধ্যে আমার বাহুবল-নবীগঞ্জ ৪৩ বছরই ছিল অবহেলিত। যে কাজ ৪৩ বছরে হয়নি সে কাজ হয়েছে মাত্র ৫ বছরে। আমি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছি। দুইটি স্কুল-কলেজকে সরকারীকরণ করেছি। ৫০টি রাস্তা, ৩৮টি ব্রীজ নির্মাণ করেছি। আমার সময়ে ৯১টির বেশী গ্রামে বিদ্যুতায়ন হয়েছে। সুতরাং জোট হউক আর একক হউক বর্তমান এমপি হিসেবে আমার মনোনয়ন চুড়ান্ত। দল থেকে এমন আভাসই আমাকে দেয়া হয়েছে।

নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি ও নবীগঞ্জ পৌর মেয়র আলহাজ্ব ছাবির আহমদ চৌধুরী বলেন, আমরা বর্তমানে জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে যাচ্ছি। যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তা হলে ধানের শীষে আলহাজ্ব শেখ সুজাত মিয়ার বিজয় নিশ্চিত। আলহাজ্ব শেখ সুজাতের দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাহুবল-নবীগঞ্জের বিএনপি অত্যান্ত শক্তিশালী। যার প্রমাণ বিগত উপ-নির্বাচন।

আওয়ামীলীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডাঃ মুশফিক হোসেন চৌধুরী বলেন, ৩০ বছর দল ও এলাকার সাথে আমি সম্পৃক্ত আছি। গত প্রায় ৬ বছর ধরে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে আমার নির্বাচনী এলাকাসহ সমগ্র হবিগঞ্জ জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছি। সেই হিসেবে আমার মনোনয়ন ও বিজয় সুনিশ্চিত।

তিনি বলেন, গত উপ-নির্বাচানেও দলীয় কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের কারণে অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে নৌকার বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। যারা আজ নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী তাদের সাথে দল ও সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক নেই।

আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী জানান, গত নির্বাচনে দল ও মাহাজোট থেকে তার মনোনয়ন চুড়ান্ত ছিল। কিন্ত দেশ, জাতি ও মহাজোটের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন।

তিনি জানান, নেত্রী তাকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন পরবর্তীতে বিবেচনা করা হবে। তিনি নেত্রীর প্রতিশ্র“তির উপর আস্থাশীল।

হবিহগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি, নবীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী বলেন, আমি তৃণমূলের কর্মী। ৩৮ বছর যাবত আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি শতভাগ আশাবাদি দল আমাকে মুল্যায়ন করবে এবং আসনটি পুনরুদ্ধার হবে।

তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার মধ্যে নবীগঞ্জ সবচেয়ে বড় উপজেলা। এখানে প্রায় পৌনে ৩ লক্ষ ভোটার। আমি সরাসরি নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থীকে পরজিত করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। মনোনয়ন পেলে ইনশাআল­াহ বিজয়ী হব।

খেলাফত মজলিসের সম্ভাব্য প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম জাকী বলেন, খেলাফত মজলিস ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক। আমি আমার দলের ও জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী। কারণ বাহুবল-নবীগঞ্জে আমাদের দলীয় অবস্থান দেশের অনেক এলাকার তুলনায় মজবুত। ২০১১ সালে উপ-নির্বাচনে আমরা পৃথক নির্বাচন করে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থার জানান দিয়েছি। আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা এ আসনটি ছেড়ে দেয়ার জন্য জোটে জোরদাবি জানিয়েছেন। তবে তার পরও জোটের যে কোন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

এ অবস্থায় এলাকার সাধারন ভোটার ও সচেতন মহল মনে করেন, আসনটি আওয়ামীলীগের ঘাটি হলেও ঘরের আগুনে পুড়ছে দলটি। অপরদিকে কিছুটা হলেও স্বস্থিতে রয়েছে বিএনপি-জাপা। এছাড়াও প্রতিটি দল থেকে আরও একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীরা গণসংযোগসহ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

শেয়ার করুন