২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
আজকের সিলেট ডেস্ক : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেওয়া ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। বলেছেন, ‘প্রথমত সরকার বিএনপিকে অনেক দিন ধরেই কোনো রকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে অনুমতি দিচ্ছিল না। সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী তাদের অনুমতি দিয়েছে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। দ্বিতীয়ত বিরোধীদল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। আর শক্তিশালী বিরোধীদল ক্রিয়াশীল গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।’
বেসরকারি টিভি স্টেশন চ্যানেল আইয়ের আজকের সংবাদপত্র অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মুজমদার এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের প্রয়োজনীয়তা সরকার উপলব্ধি করতে করেই বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে। তারা বড় সমাবেশ করেছে কিন্তু শান্তিপূর্ণ ছিল। আমরা শুনেছি, দেখেছি, এতে কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি, সহিংসতা হয়নি। কাজেই এটাও নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।’
‘যেহেতু নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে। তাই এখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেয়া জরুরি। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও যেন সুশৃঙ্খলভাবে হয়, সহিংসতা যাতে না হয়, বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, কেউ যাতে আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন না করে নাগরিক হিসেবে সেটাও আমাদের প্রত্যাশা।’
নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে, সংসদ থাকবে, সরকার প্রধানও থাকবেন- আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যের বিষয়ে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিতে চরম বিরোধ বিরাজ করছে। দুই পক্ষের দুই ধরনের যুক্তি, দুই ধরনের মতামত। তবে সরকার চাইলে অবশ্যই পারে। ঈদের আগে ছাত্র-তরুণদের মুক্তি দিল। কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের যে আন্দোলন তখন কিন্তু সরকার বিরোধিতা করেনি। সরকার কৃতিত্বও নিয়েছে। সরকার যদি চায় তাহলে নির্বাচনেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা (ক্ষমতাসীন দল) যে বলছে, তাদের যে কিছু করার নেই, আমি বলবো তাদের দাবি সঠিক নয়।’
নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার বিষয়ে বিএনপির দাবির বিষয়ে মুজমদার বলেন, ‘সেনাবাহিনী মোতায়েন করা কোনো ব্যাপারই না। নির্বাচন কমিশন যদি চায় তাহলে মোতায়েন হতেই পারে। আর সেনাবাহিনী আগেও মোতায়েন হয়েছে।’
‘আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে সংজ্ঞা, ২০০৭-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞাতে সেখানে কিন্তু সেনাবাহিনী ছিল। ২০০৯ সালে যখন এটা আইন হিসেবে পাস হয়, সংসদের অনুমোদনের সময় তারা এটা বাদ দিয়েছে। সপ্তাহখানের মধ্যে সংসদ বসছে। আমাদের আরপিওতো সংশোধন হবে।’
আরপিও সংশোধন করে তড়িঘড়ি করে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে বিতর্ক আছে। ইভিএম এর বিষয়ে গত অক্টোবর মাসে ২৩টি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে সংলাপ করেছিল। তার মধ্যে ১২টা কিন্তু ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে ছিল। কোনো কোনো দল শর্তসাপেক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন।’
‘মহাজোটের শরিক যারা ৭-৮টা দল ইভিএম এর পক্ষে ছিল। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব বলেছিলেন যে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এটা ব্যবহার করা হবে না। সবাই ধরে নিয়েছে যে, যেহেতু অধিকাংশ দলই বিরোধিতা করেছে, তাহলে এটা ব্যবহার হবে না। কিন্তু হঠাৎ করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শুনে আসছি যে, ইভিএম শুধু ব্যবহারই করা হবে না, এটা অত্যন্ত বড় আকারে ব্যবহার করা হবে। ১০০ আসনে ব্যবহার করা হবে। এমনকি ইভিএম কেনার অর্ডার দিয়েছে প্রকল্প অনুমোদ হওয়ার আগেই।’
এ ব্যাপারে টেন্ডার হয়েছে কি-না সংশয় প্রকাশ করে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের ক্রয় নীতিমালা এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা? প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বিরাট অঙ্কের ব্যয়। এই টাকাটা কোন সোর্স (উৎস) থেকে আসবে সেটাও আমরা জানি না।’
‘এখন প্রশ্ন আসতে পারে ইভিএম ব্যবহার কেন? এটা কি প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য? নাকি নির্বাচনে ভোট কারচুপি বন্ধ করবো? নাকি আমাদের টাকা খরচ করার সুযোগ আসছে টাকা খরচ করবো? কি উদ্দেশ্যে এটা করা হচ্ছে? যদি প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা আসে তাহলে ভোটার তালিকা থেকে রিমোটলি ভোট দেয়া পর্যন্ত অনেক রকম প্রযুক্তি আছে। আবার কি ধরনের ইভিএম ব্যবহার করা হবে? কেউ কিছু জানে না। এটার কি কি বৈশিষ্ট্য, এটায় কোনো বায়োমেট্রিক্স থাকবে কি-না, বায়োমেট্রিক্স না থাকলে যে কোনো লোকই তো ভোট দিতে পারবে। তাহলে যে কোনো ব্যক্তিইতো ভোট কারচুপি করতে পারবে। ইভিএম এ চাপ দিয়ে জাল ভোট দিতে পারবে। তাছাড়া এক একটি ইভিএম ব্যবহারের জন্য কয়েকজন দক্ষ লোক লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের লোকদেরও প্রশিক্ষণ নেই। যদি পাশের দেশে ভারতে দেখি, সেখানে ইভিএম ব্যবহার করে আসছে অনেক বছর ধরে। এখন দেশটির সবগুলো বিরোধীদল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এত বছর অভিজ্ঞতার পর। ভারতের একটি খবরের কাগজে রেফারেন্স দিয়ে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা লিখেছে যে, অল্প কয়েকটা দেশেই ইভিএম ব্যবহার হয়। উন্নত দেশগুলোতেও ইভিএম ব্যবহার হয় না। ১১টি দেশ ইভিএম এর ব্যবহার নিয়ে নীরিক্ষা করেছে। সবগুলো দেশই এই ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্য দেশগুলো যখন এটা ব্যবহার করছে না বা ব্যবহারের বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে, তাহলে আমাদের কেন এত তড়িঘড়ি এই শেষ মূহুর্তে? দুর্ভাগ্যবশত দেশে নির্বাচন নিয়ে অনেক রকম জটিলতা আছে। অনেক রকম বিতর্ক আছে। আরেকটি বিতর্ক করা সৃষ্টি করার কি দরকার আছে।’
সম্প্রতি যে সিটি নির্বাচন হলো সেগুলোকে খুলনা মডেলের নির্বাচন বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন বলা হয় মন্তব্য করে বদিউল বলেন, ‘এগুলোতে মানুষের মনে অনেক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ইসি কমিশনার মাহবুব তালুকদার এটাই বলেছেন। নির্বাচন কমিশন আগের সিদ্ধান্ত থেকে কেন সরে আসলো? নির্বাচন কমিশনতো রোডম্যাপ দিয়েছে। রোডম্যাপ মানে কি? কতগুলো কাজ তারা চিহ্নিত করেছে, কি কি কাজ তারা করবে, এসব। ইভিএম ব্যবহার কিন্তু তাদের রোডম্যাপের মধ্যে ছিল না। তাছাড়া আমাদের বিদ্যুতের যে অবস্থা সেদিকে যাওয়াও ঠিক হবে না।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশন দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাদের সম্মতি নিয়েই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ইভিএমসহ অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেবে।