২৭ আগস্ট ২০১৮
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৃত্যুকে হাতে নিয়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চৈতন্যগঞ্জে ধলাই নদীর বুকে অর্ধ ঝুলন্ত পাকা বাড়িতে বসবাস করছেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন দাশ ও তার পরিবার। গত কয়েক বছরের বন্যায় পর্যায়ক্রমে ও ধলই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনে এ বাড়ির অর্ধেক রয়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধে আর বাকি অর্ধেক ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে ধলাই নদীর বুকে। যে কোন সময় ঝুলন্ত ঘর ভেঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন দাশ(৭০) বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে জয় পেলেও প্রকৃতির সাথে য্দ্ধু করে তিনি আজ পরাজিত। কয়েক বছর ধরেই চৈতন্যগঞ্জ গ্রাম এলাকায় ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধ ও তার বাড়িতে ভাঙ্গন শুরু হয়। প্রথমে বাড়ির পাশের খালি জমি, পরে পর্যায়ক্রমে বসত গৃহ ভাঙ্গতে শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার গত বছর তার বসত ঘরের নিচে বালির বস্তা দিয়ে ভাঙ্গন রোধের ব্যবস্থা নিলেও সাম্প্রতিক বন্যার পানিতে বালির বস্তা সরে গিয়ে তার বাড়িটি এখন ধলাই নদীর বুকে ঝুলে আছে। অন্যত্র নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করেও যেতে পারছেন না আর্থিক দৈন্যতার কারণে।
তিনি আরও জানান, তার বাড়িসহ এই এলাকা এবং চৈতন্যগঞ্জে চিফ হ্ইুপ উপাধ্যক্ষ এম এ শহীদ ধলাই সেতুও ঝুঁকিতে রয়েছে।
গ্রামবাসী জানান, গত প্রায় ১০ বছরে চৈতন্যগঞ্জ গ্রাম এলাকার ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে অসংখ্য বসতঘর নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। অনেক পরিবার জমিজমা ও বসতঘর হারিয়ে স্থান ত্যাগ করে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিলেও মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন দাশ স্বপরিবারে এখনও ঝুঁকির মাঝে বসবাস করছেন। নিরঞ্জন দাশের ছোট ভাই নবদ্বীপ কুমার দাশ জানান, শুধু নিজের ঘর নয়, ইতোমধ্যে তাদের গোয়াল ঘরও বিলিন হয়েছে নদীগর্ভে।
নিরঞ্জন দাশের স্ত্রী খেলা রানী দাশ জানান, ৩ দেবর, জা, ছেলে মেয়েসহ ১৬ জনের সংসার। কয়েক বছর আগে অনেক কষ্ট করে পাকা বাড়ি তৈরী করেছিলেন তার স্বামী ও দেবর। চোখের সামনেই সে ঘরের অর্ধেক নদীর গর্ভে বিলিন হয়েছে। এখন ঝুলে থাকা ঘরেই সন্তানাদি নিয়ে বসবাস করছেন।
মুক্তিযোদ্ধা এই পরিবারের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করার বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান জানান, তাকে বাড়ি তৈরী করে দেয়ার তহবিল ইউনিয়ন পরিষদের নেই। তবে এ বিষয়টি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হক জানান, চৈতন্যগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ঝূঁকিপূর্ণ বসবাসের কথা শুনেছেন। তিনি সরেজমিন ঘুরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিবেন।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, চলিত বছরের জুন মাসের বন্যায় ধলাই ও মনু নদীর পানি বৃদ্ধিতে আগের সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছে। সেই সাথে ছিল প্রচন্ড স্রোত। পুরো জেলায় দুই নদীর ২৬টি স্থানে বিশাল ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। এক মাস আগে পানি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল ধলাই ও মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। প্রতিনিধি দলটি এ দুটি নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধানে একটি প্রস্তাবনা জমা করেছেন অধিদপ্তরে। এর মধ্যে এ দুটি নদীসহ জেলার ৯টি নদ-নদী খননের প্রস্তাবনাও রয়েছে। এ প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হলে চৈতন্যগঞ্জের এ সমস্যা থাকবে না।
(আজকের সিলেট/২৭ আগস্ট/ডি/কেআর/ঘ.)