২১ জুন ২০১৮


বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কে পুকুরসম গর্ত

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : ‘ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ হাজী মাসুক মিয়া। সিলেট নগর থেকে উপজেলা সদর জগন্নাথপুরের দূরত্বই বা আর কতো। সকাল বেলা প্রাইভেটকারে করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাড়ির টানে যাত্রা শুরু তার। প্রাইভেটকারটি বেশ গতিতেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ থমকে গেল কারের চাকা। রাস্তায় বিশাল পুকুরসম গর্ত। পানি আর পানি।

কারের চালক জানালেন, গাড়ি থেকে সকলকে নেমে যেতে হবে। তারপরে চেষ্টা করে দেখবো গর্ত দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যায় কি না। এরপর বৃদ্ধ মাসুক মিয়াসহ যাত্রীরা নেমে রাস্তার পার্শ্বের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে গর্তের ওপারে গেলেন। চালক এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে কারটি নিয়ে পার হলেন পুকুরসম দুটি গর্ত।’

ঈদে বাড়ি যেতে বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কের মিয়ারবাজারে সড়কের বিশাল গর্তে লোকজনকে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কেবল যাওয়ার পথেই নয়; ঈদ শেষে নগরে ফেরার পথেও এমন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন লোকজন। গত সোমবার দুপুরে সরেজমিন দুর্ভোগের এই চিত্র দেখা গেছে। শুধু যে মিয়ারবাজারই তা-নয়, প্রবাসী অধ্যুষিত দু’উপজেলার ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই সড়কটির অসংখ্য স্থানে এমন গর্ত সৃষ্টি হলেও এ নিয়ে নির্বিকার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এল.জি.ই.ডি)।

বিশ্বনাথ ও জগন্নাথপুর উপজেলা এল.জি.ই.ডি’র প্রকৌশলী সাময়িক-সংস্কার কাজ শুরুর কথা বললেও সড়কটির সংস্কারে কোনো প্রকল্পের সুখবর দিতে পারেননি।
বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর আঞ্চলিক সড়কটির দৈর্ঘ্য ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিশ্বনাথ উপজেলা অংশে ১২ কিলোমিটার ও জগন্নাথপুর উপজেলা অংশে ১৩ কিলোমিটার। সড়কটির মধ্যে বিশ্বনাথ অংশের মিয়ারবাজারের পূর্বপার্শ্বে গত ৬ মাস ধরে সড়ক ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিপাত শুরুর পর গর্ত পুকুরের আদলে রূপ নেয়। পাশাপাশি দু’টি বড় বড় গর্ত হলেও এনিয়ে এল.জি.ই.ডি’র কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। একই অবস্থা পীরেরবাজারের পূর্বের অংশের। বৃষ্টি শুরুর আগে এখানে একটিমাত্র গর্ত থাকলেও বৃষ্টি শুরুর পর এই চিত্র পাল্টে গেছে। বর্তমানে সেখানে পাশাপাশি ৪টি বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্বনাথ বাজারের সড়কে, কালিগঞ্জ ও বাগিছাবাজারের মধ্যবর্তী এলাকাসহ বিশ্বনাথ অংশের অসংখ্য স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে সড়কটির বেহালদশার এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বিশ্বনাথ উপজেলার মতো জগন্নাথপুরের অংশের অবস্থা আরো করুণ ও অবর্ণনীয়। জগন্নাথপুরের ১৩ কিলোমিটার সড়ক ৩ কোটি টাকা দিয়ে দেড় বছর আগে সংস্কার করা হলেও নিম্নমানের কাজ করার ফলে দেড় বছরের মাথায় এসে সড়কটিতে আবারো সেই পুরনো গর্ত তৈরি হয়েছে। সড়কটির মিরপুর থেকে পৌর পয়েন্ট পর্যন্ত অসংখ্য স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এমন তথ্য খোদ জগন্নাথপুর উপজেলা এল.জি.ই.ডি’র প্রকৌশলী গোলাম সারওয়ার জানিয়েছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, জগন্নাথপুর উপজেলা হাসপাতালের পশ্চিমের সড়কটিতে পাশাপাশি দু’টি বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গর্তে একটি মালবাহী ট্রাক আটকে গেলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। এরপর ইট-সুড়কি দিয়ে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করা হলেও তা কাজে আসেনি। গত দু’দিন আগেও গর্তের সেই আগের চিত্রই দেখা গেছে। এছাড়াও ইসহাকপুর হাইস্কুলের সামনে সড়ক দেবে গেছে। বটেরতল এলাকার চিত্রও একই।

ভুক্তভোগী লোকজন জানান, বিশ্বনাথ ও জগন্নাথপুর উপজেলার প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। নাড়ির টানে ছুটে আসেন প্রবাসীরা। কিন্তু বেহাল এই সড়ক দেখে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ হয়ে যান তারা। প্রতিদিন হাজার হাজার লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চললেও এ নিয়ে উদাসীন সড়কটির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ এল.জি.ই.ডি। ভুক্তভোগীরা সড়কটি দ্রুত সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে, এল.জি.ই.ডি সূত্র জানায়, মিয়ারবাজারের পুকুরসম গর্তের খবর শুনে এল.জি.ই.ডি সিলেট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী এম.এম. মহসিনসহ এল.জি.ই.ডি কর্মকর্তারা ছুটে যান। তিনি গর্ত ভরাট করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিলে সাময়িক গর্ত ভরাটের কাজ শুরু হয়। মঙ্গলবার কাজ করা হলেও পুরো গর্ত ভরাট করা সম্ভব হয়নি। তবে এই গর্ত ভরাট করে জনদুর্ভোগ লাঘব করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কিন্তু অন্য গর্তগুলো ভরাটে আপাতত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে এল.জি.ই.ডি জগন্নাথপুরের উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম সারওয়ার বলেন, আমার ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে মিরপুর থেকে পৌর পয়েন্ট পর্যন্ত বেশ কিছু গর্ত আছে। এগুলো দ্রুত সংস্কারে ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি। সংস্কার না করলে ঠিকাদারের জামানতের ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে কাজ করানো হবে।

তিনি বলেন, বর্ষার পর নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে আবারো সংস্কার কাজ করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

এল.জি.ই.ডি বিশ্বনাথের উপজেলা প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, আপাতত মিয়ারবাজারে গর্ত ভরাট করে কিছুটা হলেও দুর্ভোগের অবসান হবে। পীরেরবাজার ও বিশ্বনাথ বাজারের গর্ত আপাতত ভরাট হচ্ছে না। তবে আমরা প্রকল্প গ্রহণ করছি। হয়তো শুকনো মৌসুমে কাজ হতে পারে প্রকল্প অনুমোদন হলে।

তিনি বলেন, সড়কটি সংস্কারে ৬ মাস আগে একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি অনুমোদন না হওয়ায় আমরা কিছুই করতে পারিনি। ফলে বৃষ্টিপাতে এখন নতুন গর্ত হচ্ছে।

(আজকের সিলেট/২১ জুন/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন