১৯ এপ্রিল ২০১৮


হাওরে ফিরে এসেছে প্রাণ, কৃষকের মুখে হাসি

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : দু’বছর পর আবারো হাওরে প্রাণ ফিরে এসেছে। চলছে ধান কাটা-মাড়াইয়ের ধুম। নিঃস্ব কৃষকের মলিন চেহারায় ফুটে উঠেছে খুশির ঝিলিক। অবশ্য বাম্পার ফলনের পরও ধান কাটা শ্রমিকের স্বল্পতায় কৃষকদের ‘টেনশনে’ ফেলে দিয়েছে। এ বছর সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৪ লাখ ৮১ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে ইরি, বোরো আবাদ করা হয়েছিল। আবাদকৃত জমি থেকে অন্তত ২০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আলতাবুর রহমান বলেছেন, দু’বছর পর এবার হাওরে ধান কাটার উৎসব শুরু হয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগ ও হাওর পারের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের ৩০ মার্চ থেকেই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওর পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। বোরো ফসলের জন্য দেশের অন্যতম জেলা সুনামগঞ্জের সবকটি হাওরের ফসল এক সপ্তাহের মধ্যেই পানিতে তলিয়ে যায়। একইভাবে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার হাওরের ধানও তলিয়ে যায় বানের পানিতে। এর ফলে হাওর পারের ঘরে ঘরে কান্নার আওয়াজ উঠে। একমাত্র অবলম্বন ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক তাদের চাষাবাদের সম্বল হালের বলদ-গরু পানির দামে বিক্রি করে দেন। অনেকে নিজের ভিটে-মাটিও বিক্রি করে দেন। এর আগের বছরেও কৃষকরা তাদের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হন।

টানা দু’বারের ফসলহানির পর এবার বাম্পার ফলনে নিঃস্ব কৃষকদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে। কৃষকদের চেহারায় ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা সিলেটের ডাককে এমনই অনুভূতি জানান। কৃষকরা দু’বছর ফসল হারানোর পর এবারের ফলন আমাদেরকে দু’বছরের দুঃখ-কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছে। অবশ্য কিছু এলাকায় শীলা বৃষ্টি ও পোকায় কিছুটা ক্ষতি করেছে বলে তারা জানিয়েছেন।

কৃষকরা জানান, সকল হাওরেই এবার ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে হাওরের ধান প্রায় ৬০ ভাগেরও বেশি পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের ফলে সময়মতো ধান কেটে মাড়াই দেয়া যাচ্ছে না। চড়া দাম দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা জানান, গত দু’বছরের ফসলহানিতে শ্রমিকরা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এবার ফাল্গুনের আগেই পাবনা-সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শ্রমিক সর্দাররা এসে গৃহস্থদের কাছ থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার জন্যে অগ্রিম টাকা নিয়ে গেছে।

কিন্তু অনেক সর্দারই শ্রমিক নিয়ে আসে নি। এমনকি গৃহস্থদের ফোনও রিসিভ করছে না। বিশেষ করে ধানের দেশ খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার কৃষকরা শ্রমিক সংকটের ফলে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা তাদের এই দুর্ভোগের কথা সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন।

কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগে এ বছর ৪ লাখ ৮১ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রীড ৮২ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৬ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ধান ১৬ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। আবাদকৃত জমির মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৭২৯ হেক্টর, হবিগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ৪৩০ হেক্টর, মৌলভীবাজার জেলায় ৫৪ হাজার ১২ হেক্টর ও সিলেট জেলায় ৮৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ করা হয়।

কৃষি বিভাগের দেয়া আবাদের এই পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি হেক্টরে অন্তত ৪ মেট্রিক টন উৎপাদন হলে এবার কমপক্ষে ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে। কিন্তু সুনামগঞ্জ জেলায় যেহেতু ফলন হয় সর্বোচ্চ সেই হিসেবে কমপক্ষে ২০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে। প্রতি কেদারে ১৫ মন উৎপাদন হলে ১৯ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেবল সুনামগঞ্জ জেলায় প্রতি কেদার জমিতে ১৫ থেকে ২৫ মন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। এই হিসেবে এবার উৎপাদন ২০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কৃষকরা। তবে বৈশাখ থেকেই ধানের ন্যায্য দাম নির্ধারণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো: আলতাবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, পর পর দু’বার ফসল হারোনোর পরে এবার বাম্পার ফলন হওয়ায় আমাদের কৃষকদের মাঝে আনন্দের জোয়ার বইছে।

ফসল হারোনো কৃষকদের পাশে কৃষি বিভাগ ছিল। এবারও আমরা বিভিন্ন হাওরে গিয়ে কৃষকদের আনন্দের সাথে শরীক হয়েছি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে খুবই ভালো ফলন হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের বাম্পার ফলন দেশের খাদ্য চাহিদায় অনন্য অবদান রাখবে।

(আজকের সিলেট/১৯ এপ্রিল/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন