২৫ নভেম্বর ২০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক : মাওলানা শাহীনূর পাশা অ্যাভভোকেটকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘটে গেলো এ অঘটন। তাই তাকে নিয়ে বইছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। প্রশ্ন জাগে, ‘তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, না তিনি নিজেই অব্যাহতি পাওয়ার বা দলত্যাগের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন ? আদৌ তিনি রাজনীতি করবেন কি না, করলেই বা বর্তমান সময়ে তার রাজনীতির খুটি কী ?’
দলীয় সূত্রমতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আবারো এমপি পদে নির্বাচিত হওয়ার মানসেই তিনি দল থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পথ খোঁজছিলেন। কারণ, তার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর একটি। তাই দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে এককভাবে নির্বাচনী লবিং করে দল থেকে অব্যাহতি লাভ করেছেন তিনি। ফলে খণ্ডকালীন সময়ের জন্য হলেও তার রাজনৈতিক জীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। তবে সকল বিপর্যয় ঠেকিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলে সদা সিদ্ধহস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী।
সূত্রমতে বর্তমান সময়ে জাতীয় নির্বাচন বর্জনে অনড় ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। তাই এ দল থেকে তার পক্ষে নির্বাচনী উদ্দেশ্য হাসিল আদৌ সম্ভব নয়। করতে হলে নিজদল জমিয়ত,ছাড়তেই হবে তাকে। আর এটা আগে থেকেই ভালো করে জানতেন তিনি। তবে নিজে থেকে জমিয়ত ত্যাগ করে অন্য কোনো দলে যাওয়া বা অন্য কোনো দল গঠন করলে তাকে দোষারোপ করা হতো এবং তাকে বলা হতো ব্যক্তিস্বার্থে দলত্যাগী নেতা। তাই নিজে থেকে দলছুট না হয়ে এমন কৌশল অবলম্বন করলেন, যাতে দল তাকে ছুড়ে ফেলতে বাধ্য হয় এবং কার্যত তাই ঘটেছে। দল তাকে অব্যাহতি দিয়ে দিল, প্রথমিক সদস্যপদসহ কেড়ে নিল দলের সকল পদপদবী। কৌশলে দলত্যাগী হওয়ার তকমা থেকে বেঁচে গেলেন তিনি। তবে দল থেকে বাদ পড়লেও রাজনীতি ও নির্বাচন করতেই হবে, এটাই তার দৃঢ়প্রত্যয়।
অতীতে জমিয়তে ইলামায়ে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ছিল জমিয়তে তোলাবায়ে ইসলাম। জমিয়তের সেই ছাত্র সংগঠনকে পাশ কাটিয়ে শাহীনূর পাশা চৌধুরী আশির দশকের শুরুতে নিজেই গঠন করেন বাংলাদেশ মুসলিম ছাত্র পরিষদ। নিজহাতে গড়া ছাত্র সংগঠন থেকেই মূলত তার রাজনীতির হাতে খড়ি। জমিয়তে তোলাবা’র বাংলা সংস্করণ ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ হলে পরে তিনি নিজেই বিলুপ্তি ঘটান বাংলাদেশ মুসলিম ছাত্র পরিষদের। ঢুকে পড়েন জমিয়তের রাজনীতিতে। ঐতিহ্যবাহী দল জমিয়তকে ভেঙ্গে তিনটুকরো করার মূলে তার কালো হাত ছিল বলেই আলেম-ওলামা অভিযোগ করেছেন।
শাহীনূর পাশা চৌধুরী শিক্ষাজীবনে জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে শাহজালাল, সিলেট থেকে ১৯৮৫ সালে ফারেগ হলেও আলিয়া মাদ্রাসার সনদ নিয়ে কলেজ থেকে শুরু করে এল্এলবি । কোনো বুজুর্গ বা নামীদামী আলেম না হলেও রাজনীতির ময়দানে তার পথচলা দীর্ঘ। এই দীর্ঘ পথচলা দিয়ে হার মানিয়েছেন সিলেটের অসংখ্য বুজুর্গ আলেম-ওলামাদেরকে। তাদেরকে টপকিয়ে জমিয়তের কেন্দ্রে পৌঁছে চলে যান জাতীয় সংসদ পর্যন্ত ।
জমিয়তে যোগদান করে বিগত ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হন শাহীনূর পাশা। বিএনপির জোটের বিপুল ভোট পেয়েও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের কাছে কৌশলে পরাজিত হয়ে যান তিনি। সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার আমলের উপনির্বাচনে অবশিষ্ট ১৪ মাসের মেয়াদে শাহীনূর পাশা চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
অভিযোগ রয়েছে, সামাদ আজাদের মৃত্যুর খবরে সেদিন মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন শাহীনূন পাশা চৌধুরী। সিলেটের বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে মিষ্টির কার্টুন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তিনি । পরবর্তী ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির ধানের প্রতীক নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থূী হলেও জয়ের মুখ দেখেননি আর।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারো এমপি হয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার একান্ত বাসনা তার। উদ্দেশ্য সফলে কথিত ৯ টি ইসলামী দলের নেতাদের সাথে ২৩ নভেম্বর সরকারদল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতে যান শাহীনূর পাশা চৌধুরী। যদিও তিনি তার এ সাক্ষাতকে নিছক ব্যক্তিগত এবং তার বিরুদ্ধে দায়েরী মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বলে তার ফেইসবুক আইডিতে নেতাকর্মীদের শান্তনা দিয়েছেন। কিন্তু জমিয়ত নেতৃবৃন্দ ‘ক্বারীনায়ে হালিয়া ওয়া মাক্বালিয়া (কথা ও কাজের প্রেক্ষাপট) যাচাই করে তার এ সাক্ষাতকে রাজনৈতিক এবং দলীয় নীতি-আদর্শ ও শৃঙ্খলা বিরোধী ধরে নিয়ে তাকে দল থেকে ছুড়ে ফেলেন।
তবে কি শাহীনূর পাশা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন? না, তিনি আদৌ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর পাত্র নন। নিশ্চয় তিনি রাজনীতি করবেন। তাইতো দল থেকে অব্যাহতির বিষয়ে তার ফেইসবুক আইডিতে তিনি লিখেছেন, ‘জমিয়ত ১৯৪৭ সাল থেকে আছে এবং থাকবেই’। তাই ধারণা করা হচ্ছে জমিয়ত নামে অন্য কোনা নতুন রাজনৈতিক দল করে নামধারী কোনা ইসলামী জোটের শরীক হয়ে নির্বচনে যাচ্ছেন তিনি । আর এ রাজনৈতিক নাটকের মূলে তার খুটি কী ? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে।
কারো কারো ধারণা, শাহীনূর পাশা চৌধুরী ‘তৃণমূল জমিয়ত বাংলাদেশ’ নামে দল গঠন করে তৃণমূল বিএনপির সাথে জোট হয়ে অথবা কথিত কোনো ইসলামী জোটের সাথে শরীক হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চাইছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি এখনো মুখ খোলছেন না। অচিরেই কোনো একটা ব্রিফ দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।