২৪ জুন ২০১৮


সিলেটে ছড়া-নালা দখলমুক্ত কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট নগরীর ছড়া-নালা অবৈধ দখলমুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো আশানুরূপ সাফল্য দেখতে পাচ্ছে না নগরবাসী। কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। কোনো কোনো স্থানে রহস্যজনক কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্ষা আসার আগেই দ্রুত কাজ শেষ করতে না পারলে জলাবদ্ধতার পাশাপশি দুর্ঘটনারও আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টিবহুল সিলেটে ইতোমধ্যে বয়ে গেছে কয়েকটি ঝড়। এতে প্রাণ হারিয়েছেন নারী শিশুসহ চারজন। প্রবল বর্ষণও হয়েছে চার দিন। এ অবস্থায় নগরবাসী টানা বর্ষণ শুরুর আগেই চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের সফল পরিণতি দেখতে চান।

জানা গেছে, সিলেট সিটি এলাকায় ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩টি বড় ছড়া-খালের দুই পাশ এখনো দখল করে রেখেছে অবৈধ দখলদাররা। ৩০ ফুট প্রস্থের খাল কোথাও কোথাও তিন কিংবা চার ফুটে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ ছড়া-খাল দখল করে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। কোথাও আবার খালের গতিপথ পরিবর্তন করে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ভবন। ছড়া ও খাল দখল করে এ পর্যন্ত মোট ১০৫৪টি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। অবৈধ এই স্থাপনাগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ছড়া-খাল দখলদারদের একটি তালিকাও করা হয়। এতে ২৬৮ জনকে দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দখলদারদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। সিসিক ছড়া ও খালের ৭৩ কিলোমিটারের মধ্যে নকশা অনুযায়ী এ পর্যন্ত মাত্র ১১.৫ কিলোমিটার সংরক্ষণ করে দুই পাশে গার্ডওয়াল তৈরির কাজ শেষ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট নগরীতে রয়েছে ছোট বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল, যা ছড়া নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এই ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। দুই-তিন দশক আগেও এসব ছড়া দিয়ে নৌকা চলাচল করত। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সিলেট সিটি এলাকার উল্লেখযোগ্য ছড়া ও খালগুলো হচ্ছে, মালনীছড়া, ধোপাছড়া, গোয়ালিছড়া, ভুবিছড়া, গাভিয়ার খাল, যুগনীছড়া, হলদিছড়া, রতœা খাল, বারছড়া, জৈন্তারখাল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে মালনীছড়া। প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ছড়াটি সিলেট নগরীর উত্তর প্রান্ত মালনীছড়া চা বাগান থেকে উৎপত্তি হয়ে বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। নগরীর পশ্চিম বাগবাড়ি এলাকায় একটি আবাসিক প্রকল্পে ছড়া দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। ছড়াখেকোদের কবলে পড়ে দখল হয়ে গেছে প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত মালনীছড়া।

ছড়া দখল ও ভরাট করে ওই আবাসিক প্রকল্পে দশ ও এগারো তলা দু’টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পাল্টে দেয়া হয়েছে ছড়ার গতিপথও। সিটি করপোরেশন গঠনের আগে সিলেট পৌর কর্তৃপক্ষ একসময় একটি ছড়ার অংশ দখল করে ধোপাদিঘির পাড়ে নির্মাণ করে পৌর বিপণি ও সান্ধ্য বাজার এবং জিন্দাবাজারে আরেকটি ছড়ার উপর তৈরি করে তিন তারা নামের মার্কেট। এসব মার্কেটের কারণেও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে নগরীর কিছু এলাকার লোকজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

২০০৯ সালে নগরীর ছড়াগুলো দখলমুক্ত করতে ১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন। এরপর ২০১৩ সালে একই লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয় ২০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। কেনা হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। ছড়া উদ্ধারে দু’টি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও নগরবাসী তেমন সুবিধা পাননি।

এ অবস্থায় নগরীর ছড়া-খাল উদ্ধারে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নেয়া হয় ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও সন্তুষ্ট নন নগরবাসী।

বর্ষাকাল ঘনিয়ে আসায় বেশ কিছু দিন থেকে নগরজুড়ে তোড়জোড় চলছে ছড়া-নালা দখলমুক্ত করতে। বেশ কয়েকটি স্থানে সিটিমেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু অনেক স্থানে গার্ডওয়ালের কিছু কাজ করার পর বন্ধ রয়েছে বাকি কাজ। দ্রুত কাজ শেষ না করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ছড়া ঘেঁষেই অনেকে নির্মাণ করেছেন বহুতল ভবন।

বর্তমানে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের দর্শন দেউড়ি ব্রিজ থেকে সিলেট বেতারকেন্দ্র সংলগ্ন ব্রিজ পর্যন্ত মালনীছড়ার উন্নয়নকাজ থমকে আছে। কয়েক মাস আগে ছড়া দখলমুক্ত করে কয়েকটি গ্রুপে সেখানে গার্ডওয়ালের কাজ শুরু হয় জোরেশোরে। কিন্তু গত এক মাস থেকে কোনো কোনো গ্রুপের কাজ হচ্ছে না।

ছড়ার পাশে বসবাসকারী ভুক্তভোগীরা জানান, গুটিকয়েক ব্যক্তির ছলচাতুরীতে বন্ধ রয়েছে এই কাজ। কারণ, তারা ছড়ার বেশির ভাগ অংশ দখল করে বাসাবাড়ি তৈরি করেছেন। এই কাজ বন্ধ থাকার কারণে আসন্ন বর্ষা মওসুমে ছড়ার আশপাশের বাড়িঘর পানিতে ডুবে যাবে এমন আশঙ্কা ওই এলাকাবাসীর। শুধু মালনীছড়া নয়, পূর্ব দরগাগেটসহ আরো অনেক স্থানে নালা ও ছড়ার চলমান কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে বিপুল অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নগরবাসীকে পড়তে হবে দুর্ভোগে।

এ দিকে নগরীর গাভিয়ার খালে এ পর্যন্ত সাতবার অভিযান চালিয়েছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। কুয়ারপার হয়ে শেখঘাট, বাগবাড়ি, কানিশাইল, শামীমাবাদ হয়ে সুরমা নদীতে মেশা এই ছড়ার উৎসমুখ এখনো দখলমুক্ত করা যায়নি। ফলে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা দূর হচ্ছে না।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, গাভিয়ারখালসহ বিভিন্ন ছড়ার উভয় পাশে দখল ও গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। ছড়া-খালের মালিক জেলা প্রশাসন। কিন্তু উচ্ছেদ করতে হচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশনকে।

তিনি আরো বলেন, নকশা অনুযায়ী কোথাও ছড়ার পূর্ণ অস্তিত্ব নেই। নকশা মেনে ছড়া সংরক্ষণ করতে হলে উচ্ছেদ করতে হবে প্রায় হাজারখানেক স্থাপনা। এটা কোনোভাবেই সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়।

ছড়া ও খাল অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত সপ্তাহে নগরীর যতরপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ছড়ার ওপর নির্মিত ভবন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। বাগবাড়ি এলাকায়ও অভিযান চালানো হয়। একইভাবে অভিযান চালানো হয় নগরীর শামীমাবাদ এলাকায়। সেখানে ছড়া ও খালের জমি ছেড়ে দেয়ার জন্য বাসাবাড়ির মালিকদের অনুরোধ জানানো হয়। অনেকেই নিজ উদ্যোগে আবার কেউ অবৈধ স্থাপনা সরাতে গড়িমসি করেন। শামীমাবাদ এলাকায় সিসিকের ৫৬ সালের ম্যাপ অনুযায়ী ছড়ার জন্য ৩০ ফুট জমি রয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকার ছড়া এমনভাবে দখল করা হয়েছে যে, অনেকেই ছড়ার ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ করে রেখেছেন। এতে করে নগরবাসী একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার শিকার হন।

সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সিলেট নগরীর প্রধান সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকে এগিয়ে আসা উচিত।

তিনি বলেন, ছড়া, খাল ও রাস্তা দখল করে যেভাবে ভবন ও বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে সেটি খুবই দুঃখজনক। তিনি নগরবাসীকে নিজ উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।

 

(আজকের সিলেট/২৪ জুন/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন