৮ অক্টোবর ২০২৩


হত্যা মামলার বাদীকে ফাঁসাতেই ইভাকে খুন করে আপন ভাই

শেয়ার করুন

খলিলুর রহমান : স্কুল ছাত্রী ইভার হত্যাকান্ডের ঘটনার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে (ক্লুলেস) হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ। মস্তকবিহীন বিবস্ত্র ক্ষতবিক্ষত মরদেহের মাথা ও শরীর আলাদা করে পৃথক ধান ক্ষে‌তে ফেলেছে খুনীরা। হত্যার ক্লুলেস অবস্থায় উদ্ধার করা মরদেহটি ১০ বছরের স্কুলছাত্রী ইভা বেগম (১০)। সে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুর্শী গ্রামের মোশাহিদ আলীর কন‌্যা।অবশেষে জানা গেল ইভার খুনি আর কেউ নয়, তার আপন বড় ভাই রবিউল হাসান (১৯)।

একটি হত্যা মামলায় জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে মামলার বাদীকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে সঙ্গীদের নিয়ে আপন ছোট বোন ইভাকে খুন করলো রবিউল হাসান।

স্থানীয় সংবাদসূত্র জানায়,গত বুধবার (৪ অক্টোবর) সুনামগঞ্জের ছাতকে দক্ষিণ কুর্শি গ্রামের আতাউর রহমানের ধান ক্ষেতে থেকে স্কুলছাত্রী ইভার মস্তকবিহীন বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করেন গ্রামের আহমদ আলী লিটনদের জমি থেকে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা মোশাহিদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশের সন্দেহ করেন রবিউল হাসানকে।

তাকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে আপন বোনকে নৃশংসভাবে হত্যার কথা স্বীকার করেন রবিউল হাসান। ফলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্লুলেস এই হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। আপন বোন ইভাকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে হত্যার দায় স্বীকার করে শনিবার বিকালে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন রবিউল হাসান।

শনিবার (০৭ অক্টোবর) বিকেলে সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে নিজের বোনকে গলা কেটে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় রবিউল হাসান।

রবিউলের ১৬৪ ধারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের উত্তর কুর্শী গ্রামের খালেদ নূরকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইভার বড়ভাই রবিউল হাসান। এ মামলায় রবিউল হসান ও তার মা কারাভোগ করেন। ১১ মাস কারাভোগের পর একমাস আগে উচ্চ আদালতের জামিনে বেরিয়ে আসেন তারা। এক বছর পর একই দিনে এবং একই সময়ে মামলার বাদী পক্ষকে ফাঁসাতেই সহযোগীদের নিয়ে নিজের বোন ইভাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সে। আর এই হত্যার পরিকল্পনা করে কারাগারে বসেই। কারাগারে থাকাবস্থায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের বোনকে হত্যার পরিকল্পনা করে রবিউল হাসান।

ইভা দক্ষিণ কুর্শী পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ৪ অক্টোবর স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে ইভা। ওইদিন সন্ধ্যার আগে তার বোনকে গ্রামের একটি দোকানে মজা খাওয়ার জন্য ১০ টাকা দিয়ে মোবাইলের একটি মিনিট কার্ড আনার জন্য আরও ২০ টাকা দিয়ে পাঠায় রবিউল হাসান। বোনকে দোকানে পাঠিয়ে তার সহযোগীসহ রবিউল রাস্তায় অপেক্ষার করেন। মাগরিবের আযানের পর দোকান থেকে মজা ও মোবাইল মিনিট কার্ড নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় ইভাকে আটক করে গ্রামের একটি বাড়ির খড়ের ঘরে নিয়ে যায় তারা। হাত মুখসহ সমস্ত শরীর চেপে ধরে গলায় রামদা দিয়ে ইভার মস্তক দ্বি-খন্ডিত করা হয়। দেহ থেকে মস্তক আলাদা করেই ক্ষান্ত নয় ঘাতক দল, মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও ইভার উরুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করেন। পরে দেহটি বিবস্ত্র অবস্থায় গ্রামের আতাউর রহমানের ধান ক্ষেতে আর মস্তক আহমদ আলী লিটনদের জমিতে ফেলে রাখা হয়।

ঘটনার আগে বোন দোকান থেকে আর বাড়ি না ফেরায় তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে নাটক সাজায় রবিউল হাসান। ধরা পড়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় রবিউল হাসান।

আদালতে দীর্ঘ সময় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের পর বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।

গত ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইভার মস্তক বিহীন দেহটি ধান ক্ষেত থেকে উদ্ধার করেন পুলিশ। যাতে ধারণা করা হয়, দুর্বৃত্তরা পাশবিক নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করেছে। পরদিন ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি সুনামগঞ্জে মর্গে পাঠায় এবং ওইদিন ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মস্তকবিহীন দেহটি হস্তান্তর করে পুলিশ। তাছাড়া মস্তক উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রাখে পুলিশ। মরদেহ দাফন শেষে বাবা-ছেলে মামলা করতে থানায় গেলে রবিউল হাসানকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে তার দেখানো মতে গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মস্তকটি উদ্ধার করে। শনিবার ওই মস্তকটি ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ

ক্লু-লেস মামলার লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু সাঈদ, সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক সার্কেল) রণজয় চন্দ্র মল্লিক, ছাতক থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আরিফুল আলম ও এস আই মোশারফ। দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

শেয়ার করুন